সঠিক শাহাদা
তাহলে সঠিক শাহাদা কোনটি, যা মুসলমানরা দৃঢ়তার সাথে ঘোষনা দিতে পারে বা যা ঘোষনা করে নব্য মুসলমানরা মুসলমানদের দলভুক্ত হতে পারে? হয়তো বা সাহাবারা এই একি প্রশ্ন আমাদের নবী মুহম্মদকেও করেছিলেন এবং হয়তো বা তিনি উত্তর দিয়েছিলেন -
“তবে কি আমি আল্লাহ ব্যতীত অন্য কোন বিচারক অনুসন্ধান করব, অথচ তিনিই তোমাদের প্রতি বিস্তারিত গ্রন্থ অবতীর্ন করেছেন? আমি যাদেরকে গ্রন্থ প্রদান করেছি, তারা নিশ্চিত জানে যে, এটি আপনার প্রতি পালকের পক্ষ থেকে সত্যসহ অবর্তীর্ন হয়েছে। অতএব, আপনি সংশয়কারীদের অন্তর্ভুক্ত হবেন না। আপনার প্রতিপালকের বাক্য পূর্ণ সত্য ও সুষম। তাঁর বাক্যের কোন পরিবর্তনকারী নেই। তিনিই শ্রবণকারী, মহাজ্ঞানী।৬-১১৪-১১৫”
তাহলে দেখা যাচ্ছে এই প্রশ্নের উত্তর বা শাহাদা অবশ্যই কোরানে থাকতে হবে। ইব্রাহিম নবী এর প্রকৃষ্ট উদাহরন –
“যে আল্লাহর কাছে নিজেকে (أَسْلَمَ وَجْهَهُ) সমর্পন করে , সৎকাজে নিয়োজিত থাকে এবং ইব্রাহীমের ধর্ম অনুসরণ করে, যিনি একনিষ্ঠ ছিলেন, তার চাইতে উত্তম ধর্ম কার? আল্লাহ ইব্রাহীমকে বন্ধুরূপে গ্রহণ করেছেন।৪:১২৫”
স্মরনে রাখা প্রয়োজন যে, এই আয়াতটি আমাদের নবীর কাছে নাযিল হয়েছিল এবং তিনিই প্রথমে সাহাবীদের কাছে এই আয়াত তেলোয়াত বা আবৃত্তি করেছিলেন, অতঃপর কোরানের মাধ্যমে এই আয়াত আমাদের কাছে পৌছেছে। সুতরাং আমাদের সকলের উচিৎ ইব্রাহিমের ধর্ম অনুসরন করা।
“ইব্রাহীমের ধর্ম থেকে কে মুখ ফেরায়? কিন্তু সে ব্যক্তি, যে নিজেকে বোকা প্রতিপন্ন করে। নিশ্চয়ই আমি তাকে পৃথিবীতে মনোনীত করেছি এবং সে পরকালে সৎকর্মশীলদের অন্তর্ভুক্ত।২:১৩০”
শুধু বোকারাই ইব্রাহীমের ধর্ম থেকে মুখ ফেরায়। তাহলে মুসলমানদের, যারা কোরানে বিশ্বাস করে ও বোকা না হতে চায়, তাদের উচিৎ ইব্রাহিম যা করতো, তাই করা। ইব্রাহিম কি করতো? পরের আয়াতেই তা বলা আছে -
“স্মরণ কর, যখন তাকে তার পালনকর্তা বললেনঃ নিজেকে সমর্পন কর(أَسْلِمْ)। সে বললঃ আমি বিশ্বপালকের কাছে নিজেকে সমর্পন করলাম (أَسْلَمْتُ لِرَبِّ الْعَالَمِينَ)।২-১৩১”
এটাই, যা আমরা খুজতেছি। যখন আল্লাহ ইব্রাহিমকে সঠিক ধর্মের নির্দেশনা দিলেন, তখন তিনি ইব্রাহিমকে আত্মসমর্পন (আসলিমু) করতে বল্লেন এবং ইব্রাহিম বল্লেন, “আসলামতু লি রাব্বিল আলামিন।”
এভাবেই সকল মুসলমানের ঘোষনা বা শাহাদা হওয়া উচিৎ। কোন কোর্টে যদি কেউ সাক্ষ্য দেয়, ” হুজুর , আমি চোখে দেখিনি বা ঘটনাস্থলেও উপস্থিৎ ছিলাম না”, তাহলে সেই সাক্ষ্য কোন জড়বুদ্ধি সম্পন্ন মানুস ছাড়া আর কারো কাছে গ্রহনযোগ্য হবে কি? তেমনি আবু হুরায়রার শাহাদাও গ্রহনযোগ্য নয়। কারন আমরা কেউ আল্লাহকে স্বচক্ষে দেখিনি বা মুহম্মদের নবুয়ত্ব পাওয়ার বা রসূল হওয়ার ঘটনাস্থলে উপস্থিৎ ছিলাম না। এব্যপারে আল্লাহর সাক্ষ্যই যথেষ্ট। দেখুন শাহাদা।(সাক্ষ্য) (২)
ইব্রাহিমের গল্পের ধারাবাহিকতায় পরের আয়াত-
“এরই ওছিয়ত করেছে ইব্রাহীম তার সন্তানদের এবং ইয়াকুবও যে, হে আমার সন্তানগণ, নিশ্চয় আল্লাহ তোমাদের জন্য এ ধর্মকে মনোনীত করেছেন। কাজেই তোমরা মুসলমান না হয়ে (আত্মসমর্পন না করে) কখনও মৃত্যুবরণ করো না।২:১৩২”
“তোমরা কি উপস্থিত ছিলে, যখন ইয়াকুবের মৃত্যু নিকটবর্তী হয়? যখন সে সন্তানদের বললঃ আমার পর তোমরা কার এবাদত করবে? তারা বললো, আমরা তোমার পিতৃ-পুরুষ ইব্রাহীম, ইসমাঈল ও ইসহাকের উপাস্যের এবাদত করব। তিনি একক উপাস্য। আমরা সবাই তাঁর কাছে আত্মসমর্পন করলাম।২:১৩৩”
তাহলে দেখা যাচ্ছে ইব্রাহিম ও তার বংশধরগন সকলেই আল্লাহর কাছেই আত্মসমর্পন করেছিলেন। এটাই সত্য ঘটনা, এটাই কোরানের বানী। কোরানে আমাদের নবীকে আদেশ করা হয়েছে ইব্রাহিমকে অনুসরন করার জন্য। -
“তারা বলে, তোমরা ইহুদী অথবা খ্রীষ্টান হয়ে যাও, তবেই সুপথ পাবে। আপনি বলুন, কখনই নয়; বরং আমরা ইব্রাহীমের ধর্মে আছি যাতে বক্রতা নেই। সে মুশরিকদের অন্তর্ভুক্ত ছিল না। তোমরা বল, আমরা ঈমান এনেছি আল্লাহর উপর এবং যা অবতীর্ণ হয়েছে আমাদের প্রতি এবং যা অবতীর্ণ হয়েছে ইব্রাহীম…..।২:১৩৫-১৩৬”
এই একি নির্দেশনা আল্লাহ কোরানে আবারো দিয়েছেন এবং যারা এই সত্যকে গোপন করে তাদের জন্য –
“অথবা তোমরা কি বলছ যে, নিশ্চয়ই ইব্রাহীম, ইসমাঈল, ইসহাক, ইয়াকুব (আঃ) ও তাদের সন্তানগন ইহুদী অথবা খ্রীষ্টান ছিলেন? আপনি বলে দিন, তোমরা বেশী জান, না আল্লাহ বেশী জানেন? তার চাইতে অত্যাচারী কে, যে আল্লাহর পক্ষ থেকে তার কাছে প্রমাণিত সাক্ষ্যকে গোপন করে? আল্লাহ তোমাদের কর্ম সম্পর্কে বেখবর নন।২:১৪০”
তাহলে মানুস কেনো এই শাহাদা বা সাক্ষ্য গোপন করে? ইব্রাহিম ঘোষনা দিয়েছিলেন –
“আসলামতু লি রাব্বিল আলামিন” অর্থাৎ আমি দুই জাহানের প্রতিপালকের কাছে আত্মসমর্পন করলাম। এবং তিনি তার সন্তানদের ও জ্যকবকেও এই একি কাজ করতে আদেশ করেছিলেন। আমাদের নবী ও সাহাবাদেরও এই একি শাহাদা দেয়া হয়েছিল। তাহলে কেন আজ সকলে সঠিক শাহাদা গোপন করে মুনাফিকদের শাহাদা আকড়ে ধরে আছে? এতে কোনই সন্দেহ নেই যে, আমাদের রসূল ইব্রাহিমের বিশ্বাসকেই অনুসরন করেছিলেন।
“অতঃপর আপনার প্রতি প্রত্যাদেশ প্রেরণ করেছি যে, ইব্রাহীমের দ্বীন অনুসরণ করুন, যিনি একনিষ্ঠ ছিলেন এবং শির্ককারীদের অন্তর্ভূক্ত ছিলেন না।১৬:১২৩”
আমাদের নবী ও আল্লাহর আদেশ অনুযায়ী ঠিক এটাই করেছিলেন। যদি কেউ মুসলমান হতে চায় , তবে তাকে নবী যেমন ইব্রাহিমের মতো আল্লাহর কাছে নিজেকে সমর্পন করেছিলেন , তেমনি আত্মসমর্পন করা উচিৎ নয় কি?
“মানুষদের মধ্যে যারা ইব্রাহীমের অনুসরণ করেছিল, তারা, আর এই নবী এবং যারা এ নবীর প্রতি ঈমান এনেছে তারা ইব্রাহীমের ঘনিষ্ঠতম-আর আল্লাহ হচ্ছেন মুমিনদের বন্ধু।৩:৬৮”
“বলুন, যখন আমার কাছে আমার পালনকর্তার পক্ষ থেকে স্পষ্ট প্রমাণাদি এসে গেছে, তখন আল্লাহ ব্যতীত তোমরা যাকে ডাকো , তার এবাদত করতে আমাকে নিষেধ করা হয়েছে। আমাকে আদেশ করা হয়েছে বিশ্ব পালনকর্তার কাছে নিজেকে সমর্পন করতে।(ওয়া উমিরতু আন আসলিমা লি রাব্বিল আলামিন) ৪০:৬৬”
যদি কেউ এটা নিয়ে বাদানুবাদ করে, তবে তার জবাব ও কোরানে আছে -
“”যদি তারা তোমার সাথে বিতর্কে অবতীর্ণ হয় তবে বলে দাও, “আমি এবং আমার অনুসরণকারীগণ আল্লাহর প্রতি আত্নসমর্পণ করেছি।”…৩:২০
রসূল ও তার অনুসারীরা সোজা ভাষায় আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পন করেছিলেন।
“আপনি বলে দিনঃ আমরা কি আল্লাহ ব্যতীত এমন কাউকে আহবান করব, যে আমাদের উপকার করতে পারে না এবং ক্ষতিও করতে পারে না এবং আমরা কি পশ্চাৎপদে ফিরে যাব, এরপর যে, আল্লাহ আমাদেরকে পথ প্রদর্শন করেছেন? ঐ ব্যক্তির মত, যাকে শয়তানরা বনভুমিতে বিপথগামী করে দিয়েছে-সে উদভ্রান্ত হয়ে ঘোরাফেরা করছে। তার সহচররা তাকে পথের দিকে ডেকে বলছেঃ আস, আমাদের কাছে। আপনি বলে দিনঃ নিশ্চয় আল্লাহর পথই সুপথ। আমরা আদিষ্ট হয়েছি যাতে স্বীয় পালনকর্তা কাছে নিজেকে সমর্পন করি।৬:৭১”
অনেকে বলতে পারেন এই শাহাদা আমার কল্পনা প্রসূত। না এটা আমার কল্পনা নয়। এর বর্ননা কোরান থেকেই নেয়া। রানী শেবা মতান্তরে বিলকিছ যখন নিজের ভুল বুঝতে পেরে মুসলমান হয়েছিলেন তখন এই শাহাদা পড়েছিলেন -
“তাকে বলা হল, এই প্রাসাদে প্রবেশ কর। যখন সে তার প্রতি দৃষ্টিপাত করল সে ধারণা করল যে, এটা স্বচ্ছ গভীর জলাশয়। সে তার পায়ের গোছা খুলে ফেলল। সুলায়মান বলল, এটা তো স্বচ্ছ স্ফটিক নির্মিত প্রাসাদ। বিলকীস বলল, হে আমার পালনকর্তা, আমি তো নিজের প্রতি জুলুম করেছি। আমি সুলায়মানের সাথে বিশ্ব জাহানের পালনকর্তা আল্লাহর কাছে আত্নসমর্পন করলাম।২৭:৪৪”
সঠিক শাহাদা-
“আসলামতু লিল্লাহে রাব্বিল আলামিন” আমি বিশ্ব জাহানের পালনকর্তা আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পন করলাম।
