এক.
শঙ্কিত হেরাক্লিয়াস
[এই অংশের বর্ণনাকারী: ইবনে নাতুর ]
বাইজান্টাইন সম্রাট হেরাক্লিয়াস জ্যোতিষশাস্ত্রে খু্ব পারদর্শী ছিলেন এবং গ্রহ-নক্ষত্রের হিসাব জানতেন। তিনি একবার ইলিয়া তথা জেরুজালেমের বায়তুল মুকাদ্দাসে আসলেন খুব চিন্তিত ও বিমর্ষ অবস্থায়। সেখানকার একজন বড় পাদ্রীর সাথে তার কথোপকথন হলো। ইলিয়ার শাসক হেরাক্লিয়াসের বন্ধু পাদ্রী ইবনে নাতুর সহ অন্যান্য পাদ্রীও সেখানে উপস্থিত।
পাদ্রী: মনে হচ্ছে আপনার শরীর ভালো নয়।
হেরাক্লিয়াস: তারকারাজির প্রতি লক্ষ করে আমি জানতে পেরেছি যে পৃথিবীতে খতনাকারীদের বাদশাহের আবির্ভাব হয়েছে। বিশ্বে কোন্ জাতির ভেতর খতনার প্রচলন আছে, বলতে পারেন?
পাদ্রী: ইহুদি ছাড়া অন্য কোন জাতির ভেতর খতনার প্রচলন নাই। ইহুদিদের ব্যাপারে চিন্তিত হবার কোন কারণ নাই। আপনার শাসনাধীন সকল শহরে ইহুদিদের হত্যা করার নির্দেশ জারি করে দিন।
জনৈক আজ্ঞাবাহক: (হেরাক্লিয়াসের উদ্দেশ্যে) হুজুর! গাসসানের বাদশাহের একজন দূত আপনার সাক্ষাতপ্রার্থী।
হেরাক্লিয়াস: তাকে আনা হোক!
দূত: হুজুর! আমি গাসসানের বাদশাহের পক্ষ হতে আপনার কাছে এই সংবাদ নিয়ে এসেছি যে আরবদের মধ্যে এক ব্যক্তি নিজেকে নবী বলে দাবি করেছেন।
হেরাক্লিয়াস: (জনৈক আজ্ঞাবাহককে) এই দূতকে নিয়ে যাও আর সে খতনা করা কিনা সেটা পরীক্ষা করে আবার আমার কাছে নিয়ে আস।
[আজ্ঞাবাহক দূতকে নিয়ে গেল এবং কিছুক্ষণ পর আবার ফেরত নিয়ে আসল]
আজ্ঞাবাহক: হুজুর! এই দূত খতনাকৃত।
হেরাক্লিয়াস: আরবদের ভেতর কি খতনার প্রচলন আছে?
দূত: জ্বী, হুজুর! আরবদের ভেতর খতনার প্রচলন আছে।
হেরাক্লিয়াস: এই দূত যেই ব্যক্তির সংবাদ নিয়ে এসেছে, ইনিই সেই খতনাকারীদের বাদশাহ – যার আবির্ভাব ঘটেছে।
হেরাক্লিয়াস তখন জ্যোতিষশাস্ত্রে তার সমকক্ষ রোমে বসবাসকারী তার এক বন্ধুর কাছে এ ব্যাপারে একটি পত্র লিখে পাঠাল। বন্ধু খতনাকারীদের বাদশাহের আবির্ভাবের ব্যাপারে উক্ত বন্ধু হেরাক্লিয়াসের সাথে একমত পোষণ করে পত্রের উত্তর পাঠাল।
বি.দ্র. এই ঘটনাকে ইতিহাসের দৃষ্টিতে দেখতে হবে শরিয়তের মানদণ্ড হিসেবে নয়। তারকা গণনার দ্বারা আসলেই কিছু জানা যায় কি-না সেটা আমাদের আলোচ্য বিষয় নয়; তারকা গণনার দ্বারা কিছু জানা যাক বা না যাক, সেটা সত্য হোক বা মিথ্যা হোক, আমাদের জন্য এধরণের গণনা করা বা করানো দুটোই নিষিদ্ধ। যাদু দ্বারা যদিও আসলেই কিছু করা যাক না কেন, যাদু আমাদের জন্য নিষিদ্ধ। তেমনি সর্বাবস্থায় গণনা এবং গণকদের থেকে দূরে থাকা বাঞ্ছনীয়।
দুই.
অনুসন্ধানে হেরাক্লিয়াসঃ আবু সুফিয়ানকে জেরা
[এই ঘটনাটি বুখারি শরিফ ও অনেক হাদিস গ্রন্থেই এসেছে, ইতিহাস গ্রন্থে তো বটেই। এই অংশের বর্ণনাকারী আবু সুফিয়ান (রা.) যিনি তখনও ইসলাম গ্রহণ করেন নাই, এবং মক্কার কাফেরদের অন্যতম প্রধান নেতা ছিলেন। হুদাইবিয়ার সন্ধির পর তিনি বাণিজ্যের উদ্দেশ্যে সিরিয়ায় গিয়েছিলেন। তিনি যখন ইলিয়া তথা জেরুজালেমে অবস্হান করছিলেন, হেরাক্লিয়াস তাকে ও তার সঙ্গীদের ডেকে পাঠালেন। সেখানে তাদের সাথে দোভাষীর মাধ্যমে হেরাক্লিয়াসের সাথে কিছু কথোপকথন হল। ]
হেরাক্লিয়াস: আপনাদের দেশে যে ব্যক্তি নিজেকে নবী বলে দাবি করছেন, বংশের দিক দিয়ে আপনাদের মধ্যে কে তার সবচেয়ে নিকটবর্তী?
আবু সুফিয়ান: আমি।
হেরাক্লিয়াস: (দোভাষীকে) এই ব্যক্তি [আবু সুফিয়ান]-কে আমার কাছে বসাও। তার সঙ্গীদেরকে তার পেছনে কাছেই বসাও। আমি তাকে নবুয়্যতের দাবিদার সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করব। যদি এই ব্যক্তি কোন মিথ্যা বলে তার সঙ্গীরা যেন তা ধরিয়ে দেয়।
[আবু সুফিয়ান (রা.) বলেন: আমার যদি এই আশঙ্কা না হত যে আমার সঙ্গীরা আমাকে মিথ্যাবাদি সাব্যস্ত করবে, তবে খোদার কসম! সেদিন আমি মুহাম্মাদ(সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সম্পর্কে মিথ্যা বলতাম। ]
হেরাক্লিয়াস: আপনাদের দেশের নবুয়্যতের দাবিদার ব্যক্তিটির বংশমর্যাদা কেমন?
আবু সুফিয়ান: তিনি আমাদের মধ্যে উচ্চ বংশীয়।
হেরাক্লিয়াস: তার পূর্বে আপনাদের ভেতরে কেউ কি এরূপ দাবি করেছে?
আবু সুফিয়ান: না।
হেরাক্লিয়াস: তার পূর্বপুরুষদের কেউ কি বাদশাহ ছিলেন?
আবু সুফিয়ান: না।
হেরাক্লিয়াস: সম্ভ্রান্ত ও শক্তিশালি লোকেরা তার অনুসরণ করছে নাকি সাধারণ ও দুর্বল লোকেরা?
আবু সুফিয়ান: সাধারণ ও দুর্বল লোকেরা
হেরাক্লিয়াস: তার অনুসারিদের সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে না কমছে?
আবু সুফিয়ান: বাড়ছে।
হেরাক্লিয়াস: অনুসারিদের ভেতরে কেউ দ্বীন গ্রহণ করার পর এর প্রতি বিতৃষ্ণ হয়ে তা পরিত্যাগ করেছে কি?
আবু সুফিয়ান: না।
হেরাক্লিয়াস: তার এই দাবির পূর্বে আপনারা তাকে কখনও মিখ্যা বলার দোষে অভিযুক্ত করেছেন কি?
আবু সুফিয়ান: না।
হেরাক্লিয়াস: তিনি ওয়াদা ভঙ্গ করেন কি?
আবু সুফিয়ান: না। তবে বর্তমানে আমাদের সাথে তার একটি চুক্তি হয়েছে, জানি না এ ব্যাপারে তিনি কী করবেন?
হেরাক্লিয়াস: আপনারা এখন পর্যন্ত তার সাথে কোন যুদ্ধ করেছেন।
আবু সুফিয়ান: হ্যাঁ, করেছি।
হেরাক্লিয়াস: যুদ্ধের পরিণতি কী হয়েছে?
আবু সুফিয়ান: সমান সমান। কখনও তিনি জয়যুক্ত হয়েছেন, কখনও আমরা।
হেরাক্লিয়াস: তিনি আপনাদেরকে কী কী বিষয়ের আদেশ করে থাকেন?
আবু সুফিয়ান: তিনি বলেন, এক আল্লাহর এবাদত কর, তার সাথে কোন বস্তুকে শরিক কোর না। তোমাদের বাপ-দাদাদের কথা পরিত্যাগ কর। তিনি আমাদেরকে নামায পড়তে বলেন, সত্যকথা বলতে বলেন, সচ্চরিত্রতার আদেশ দেন।
[দোভাষীর মাধ্যমে আবু সুফিয়ানকে হেরাক্লিয়াস বলতে শুরু করলেন।]
হেরাক্লিয়াস: আমি আপনাকে তাঁর বংশ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করেছি। আপনি বলেছেন, তিনি আপনাদের মধ্যে উচ্চ বংশীয়। রাসূলগণ এমনিভাবে তাঁর কাওমের উচ্চ বংশেই প্রেরিত হয়ে থাকেন।
আমি আপনাকে জিজ্ঞাসা করেছি, তার পূর্বে আপনাদের ভেতরে কেউ কি এরূপ দাবি করেছে কিনা। আপনি বলেছেন, আর কেউ করেন নাই। আমি মনে মনে বললাম, যদি তাঁর পূর্বে কেউ এরূপ দাবি করত তবে ভাবতাম, এই ব্যক্তি পূর্ববর্তী ব্যক্তির অনুসরণ করছে।
আমি আপনাকে জিজ্ঞাসা করেছি, তার পূর্বপুরুষদের কেউ কি বাদশাহ ছিলেন কিনা। আপনি বলেছেন, না। আমি চিন্তা করলাম, যদি তাঁর পূর্বপুরুষদের কেউ বাদশাহ হতেন তবে মনে করতাম, এই ব্যক্তি হয়ত তাঁর পিতার রাজ্য পুনরুদ্ধার করতে চাচ্ছেন।
আমি আপনাকে জিজ্ঞাসা করেছি, তার এই দাবির পূর্বে আপনারা তাকে কখনও মিখ্যা বলার দোষে অভিযুক্ত করেছেন কিনা। আপনি বলেছেন, না। আমার ধারণা, যে ব্যক্তি মানুষের সাথে মিথ্যা বলা পরিত্যাগ করেছে, সে খোদার ব্যাপারে মিথ্যা বলতে পারে না।
আমি আপনাকে জিজ্ঞাসা করেছি, সম্ভ্রান্ত ও শক্তিশালি লোকেরা তাঁর অনুসরণ করছে নাকি সাধারণ ও দুর্বল লোকেরা তাঁর অনুসরণ করছে। আপনি বলেছেন, সাধারণ ও দুর্বল লোকেরা তাঁর অনুসরণ করছে। এ ধরণের লোকরাই রাসূলদের অনুসারী হয়ে থাকে।
আমি আপনাকে জিজ্ঞাসা করেছি, অনুসারিদের সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে না কমছে? আপনি বলেছেন, বাড়ছে। ঈমানের অবস্থা এমনই হয়ে থাকে, অত:পর তা পূর্ণতা লাভ করে।
আমি আপনাকে জিজ্ঞাসা করেছি, তার কেউ দ্বীন গ্রহণ করার পর এর প্রতি বিতৃষ্ণ হয়ে তা পরিত্যাগ করেছে কিনা। আপনি বলেছেন, না। ঈমানের স্বাদ হৃদয়ের গভীরে প্রবেশের পর এরূপই হযে থাকে।
আমি আপনাকে জিজ্ঞাসা করেছি, তিনি ওয়াদা ভঙ্গ করেন কিনা।আপনি বলেছেন, না। রাসূলরা এমনই হয়ে থাকেন, তারা কখনও ওয়াদা ভঙ্গ করেন না।
আমি আপনাকে জিজ্ঞাসা করেছি, তিনি আপনাদের কী কী বিষয়ে আদেশ দেন? আপনি বলেছেন, তিনি আপনাদের আল্লাহর এবাদত করতে এবং তাঁর সাথে কোন কিছু শরিক না করতে আদেশ করেন এবং মূর্তিপূজা করতে নিষেধ করেন। তিনি আপনাদেরকে নামায করতে, সত্যকথা বলতে এবং সচ্চরিত্র হতে আদেশ করেন।
যদি আপনার কথা সত্য হয়ে থাকে তবে অতিসত্বর তিনি আমার পায়ের নিচের এই যমিনের মালিক হবেন। আমি ভালোভাবেই জানতাম তিনি আবির্ভূত হবেন। তবে তিনি আপনাদের মাঝে আবির্ভূত হবেন তা ভাবি নাই। আমি তাঁর কাছে পৌঁছতে পারব জানলে সর্বশক্তি ব্যয় করতাম! আর আমি যদি তাঁর কাছে থাকতাম তবে তাঁর পা ধৌত করতাম!
তিন.
নবীজির (সা.) সেই পত্রখানি
[রাসূলুল্লাহ হযরত সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লামের পত্র নিয়ে সাহাবি হযরত দেহইয়া কালবি(রা.) হেরাক্লিয়াসের দরবারে উপস্হিত। মক্কার তখনকার কাফের নেতা আবু সুফিয়ান ও সেখানে রয়েছেন]
হেরাক্লিয়াস: (ভ্রাতুষ্পুত্রকে) পত্রটা পড়।
ভ্রাতুষ্পুত্র: (পড়তে লাগল) “বিসমিল্লা-হির রাহমা-নির রাহি-ম
আল্লাহর বান্দা ও রাসূল মুহাম্মাদের [সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম] পক্ষ হতে রোম প্রধান হেরাকলের নামে”
(পড়া বন্ধ করে) এই চিঠি পড়া যাবে না!
হেরাক্লিয়াস: কেন?
ভ্রাতুষ্পুত্র: প্রথমত: পত্রলেখক প্রথমে নিজের নাম লিখেছে, দ্বিতীয়ত: রোমসম্রাট না লিখে রোমপ্রধান লিখেছে!
হেরাক্লিয়াস: তোমাকে অবশ্যই পড়তে হবে।
ভ্রাতুষ্পুত্র: (পড়া শুরু করল)
|
বিসমিল্লা-হির রাহমা-নির রাহি-ম আল্লাহর বান্দা ও রাসূল মুহাম্মাদের পক্ষ হতে রোম প্রধান হেরাকলের নামে- শান্তি হোক তার প্রতি যে হেদায়াতের পথ অবলম্বন করেছে। অত:পর, আমি আপনাকে ইসলামের দাওয়াত প্রদান করছি। ইসলাম গ্রহণ করুন, নিরাপত্তা লাভ করবেন। আল্লাহতা’আলা আপনাকে দ্বিগুন সওয়াব দান করবেন। আর যদি আপনি মুখ ফিরান তবে প্রজাদের গুনাহও আপনার ওপর থাকবে। “হে আহলে কিতাবগণ! একটি বিষয়ের দিকে আস-যা তোমাদের মধ্যে ও আমাদের মধ্যে সমান- তা এই যে, আমরা আল্লাহ ব্যতীত অন্য কারো এবাদত করব না, তাঁর সাথে কোন শরিক সাব্যস্ত করব না এবং একমাত্র আল্রাহ ব্যতীত আমাদের কেউ অন্য কাউকে পারনকর্তা বানাব না। তারপর যদি তারা মুখ ফিরিয়ে নেয় তবে বলে দাও যে, সাক্ষী থাক আমরা তো মুসলমান।" |
পত্রপাঠ শেষে দরবারে কিছু হৈ চৈ হলো আবু সুফিয়ান ও তার সঙ্গীদের বের করে দেয়া হল এবং দরবারের লোকজন একে একে চলে গেল।
চার.
একজন পাদ্রীর আত্মোৎসর্গ
হেরাক্লিয়াস দেহইয়া (রা.)কে আলাদাভাবে ডেকে পাঠালেন।
হেরাক্লিয়াস: আপনার ভাল হোক! খোদার কসম! আমি ভালভাবেই জানি আপনাকে যিনি পাঠিয়েছেন তিনি প্রেরিত নবী এবং ইনিই আমাদের প্রতিক্ষীত ব্যক্তি। আমরা আমাদের কিতাবে তাঁর বর্ণনা পাই। কিন্তু রোমবাসীদের পক্ষ হতে আমি আমার প্রাণনাশের আশঙ্কা করছি। যদি এই আশংকা না হত, আমি অবশ্যই তাঁর অনুসারী হতাম। আপনি দাগাতির পাদ্রীর কাছে যান এবং আপনাদের নবীর বিষয়টি তাঁর কাছে বলুন। কারণ রোমে উনি আমার চেয়েও বড় এবং তাঁর কথা বেশি মান্য করা হয়।
হযরত দেহইয়া(রা.) পাদ্রীর কাছে আসলেন। তাকে সব কথা বললেন।
পাদ্রী: খোদার কসম! ইনি প্রেরিত নবী। আমরা তাঁর গুণাবলি ও নামসহ তাঁকে চিনি।
প্রতি রবিবারে লোকজন পাদ্রীর কাছে আসত। পাদ্রী তাদের ওযাজ নছিহত করতেন।কিন্তু এর পরের রোববার পাদ্রী তার কক্ষ হতে বের হলেন না। তার পরের রোববারেও পাদ্রী অজুহাত দেখালেন, নিজ কক্ষ হতে বের হলেন না। শুধু হযরত দেহইয়া(রা.) ভেতরে যেতেন, পাদ্রী তার সাথে কথাবার্তা বলতেন এবং বিভিন্ন বিষয় জিজ্ঞাসাবাদ করতেন। এভাবে কয়েক রোববার পাদ্রী যখন কক্ষ হতে বের হলেন না, তখন লোকজন উত্তেজিত হয়ে উঠল এবং খবর পাঠাল:
"হয় আপনি আমাদের কাছে বের হয়ে আসবেন। নয়তো আমরা জোরপূর্বক আপনার কক্ষে প্রবেশ করে আপনাকে হত্যা করব। কারণ আরবদেশীয় লোকটি আসার পর থেকে আমরা আপনার মধ্যে পরিবর্তন দেখতে পাচ্ছি।"
পাদ্রী হযরত দেহইয়া কালবি (রা)এর হাতে একটি পত্র দিয়ে বললেন:
"এই পত্রখানা আপনার নবীর কাছে দেবেন। তাঁকে আমার সালাম জানিয়ে বলবেন আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ ব্যতীত আর কোন মা’বুদ নাই এবং মুহাম্মাদ(সাল্লল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আল্লাহর রাসূল। আমি তাঁর প্রতি ঈমান এনেছি, তাঁকে সত্য বলে স্বীকার করছি এবং তাঁর অনুসারী হযেছি। আর এও বলবেন যে আমার ঈমান আনয়নকে এখানকার লোকরা পছন্দ করছে না। আর এখানে আপনি যা কিছু দেখছেন তাও বলবেন।"
এরপর পাদ্রী পোষাক পরিবর্তন করে সাদা পোষাক পড়ে বাইরে বের হয়ে আসলেন। তারপর সকলের সামনে পাঠ করলেন:
"আশহাদু আল্ লা- ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াহদাহু লা- শারিকা লাহু ওয়া আশহাদু আন্না মুহাম্মাদান ‘আবদুহু ওয়া রাসূলুহ"
লোকেরা তাঁর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল এবং তাঁকে শহীদ করে দিল।
পাঁচ.
হেরাক্লিয়াসের প্রশ্ন এবং একটি রহস্যময় তদন্তের আদ্যোপান্ত
হেরাক্লিয়াস তুজিবা গোত্রের আরবদেশীয় খৃষ্টান সর্দারকে ডাকলেন।
হেরাক্লিয়াস: প্রখর স্মরণশক্তিধর একজন আরবীকে আমার কাছে ডেকে আন।
সর্দার তনুখ গোত্রের একজনকে হাজির ক রল। হেরাক্লিয়াস তনুখিকে হাড়ের ওপর লেখা একখানি পত্র দিলেন।
হেরাক্লিয়াস: তুমি আমার এই পত্র নিয়ে নবুয়্যতের দাবিদার সেই ব্যক্তির কাছে যাও। সেখানে তুমি তিনটি বিষয় খুব ভালোভাবে স্মরণ রাখবে-
এক. তিনি আমার কাছে যে পত্র পাঠিয়েছেন সে ব্যাপারে কি তিনি কী বলেন?
দুই. আমার এই পত্র পড়ে তিনি রাত সম্পর্কে কিছু বলেন কিনা?
তিন. তাঁর পিঠের দিকে খেয়াল করে দেখবে এমন বিশেষ কিছু চোখে পড়ে কিনা যাতে মনে সন্দেহ জাগে।
তনুখি পত্র নিয়ে রওয়ানা হলেন এবং তবুকে পৌঁছলেন। সেখানে রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) একটি ঝর্ণার পাশে সাহাবিদের(রা.) মাঝে বসে ছিলেন।
তনুখি: আপনাদের নবী কোথায়?
জনৈক সাহবী(রা.): ইনি!
[তনুখি হেরাক্লিয়াসের পত্রখানা নবীজী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)কে দিলেন। তিনি পত্রখানা তাঁর কোলের ওপর রাখলেন।]
রাসূলুল্লাহ [সা.]: আপনি কোন্ গোত্রের?
তনুখি: আমি তনুখ গোত্রের লোক।
রাসূলুল্লাহ [সা.]: আপনি আপনাদের পিতা ইবরাহিম ‘আলাইহিস সালামের দ্বীন গ্রহণ করবেন কি, যা সব ধরণের ভুল-ভ্রান্তি থেকে মুক্ত?
তনুখি: আমি এক কাওমের দূত হিসেবে এসেছি এবং এক কাওমের ধর্মের ওপর রয়েছি। তাদের কাছে ফেরত না যাওয়া পর্যন্ত আমি তা ত্যাগ করতে পারি না।
রাসূলুল্লাহ [সা.]:
إِنَّكَ لَا تَهْدِي مَنْ أَحْبَبْتَ وَلَكِنَّ اللَّهَ يَهْدِي مَن يَشَاء وَهُوَ أَعْلَمُ بِالْمُهْتَدِينَ
আপনি যাকে পছন্দ করেন, তাকে হেদায়াত করতে পারেন না, আল্লাহ তাআলা যাকে ইচ্ছা হেদায়াত দান করেন। হেদয়াতপ্রাপ্তদের সম্পর্কে তিনি অবগত আছেন।[২৮:৫৬]
হে তনুখি ভাই! আমি নাজাশির কাছে পত্র লিখেছি, কিন্তু সে আমার পত্রখানা ছিঁড়ে ফেলেছে। আল্লাহ তাআলাও তাকে এবং তার দেশকে টুকরা টুকরা করে দেবেন। আর তোমাদের বাদশাহের কাছেও পত্র লিখেছি, সে আমার পত্রকে হেফাযত করেছে। অতএব যতদিন তার জীবনে কল্যাণ লেখা আছে ততদিন জনগণ তাকে ভয় করতে থাকবে।
তনুখি তীরদান থেকে একটি তীর বের করে তার অগ্রভাগ দিয়ে চামড়ার তৈরি তরবারির খাপের ওপর কখাটা লিখে রাখলেন। কারণ এটা হেরাক্লিয়াস যে তিনটি বিষয় লক্ষ করার নির্দেশ দিয়েছিলেন এটা ছিল তার প্রথমটি।
অত:পর রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাঁর বামপাশে বসা এক ব্যক্তিকে হেরাক্লিয়াসের পত্রটা পড়তে দিলেন।
তনুখি: পত্রপাঠকারী এই ব্যক্তি কে?
জনৈক সাহাবী(রা.): ইনি হযরত মুআবিয়া।
মুআবিয়া(রা.): (পত্র পড়তে লাগলেন) ‘তিনি আমাকে এমন বেহেশতের দিকে আহ্বান করছেন যার প্রশস্ততা আসমান ও যমিন সমতুল্য’ তাহলে দোযখ কোথায় হবে?
রাসূলুল্লাহ [সা.]: সুবহানাল্লাহ! যখন দিন হয় তখন রাত কোথায় থাকে?
তনুখি তীরদান থেকে একটি তীর বের করে তার অগ্রভাগ দিয়ে চামড়ার তৈরি তরবারির খাপের ওপর কখাটা লিখে রাখলেন। কারণ এটা হেরাক্লিয়াস যে তিনটি বিষয় লক্ষ করার নির্দেশ দিয়েছিলেন এটা ছিল তার দ্বিতীয়টি।
রাসূলুল্লাহ [সা.]: আপনি একজন মেহমান হিসেবে এসেছেন। আপনার হক রয়েছে। আমাদের কাছে কিছু থাকলে অবশ্যই উপহারস্বরূপ আমরা আপনাকে তা দিতাম। কিন্তু বর্তমানে আমরা সফরে আছি, আমাদের পাথেয় সম্পূর্ণ শেষ হয়ে গেছে।
হযরত ওসমান(রা.): আমি উনাকে উপহার দেব।
হযরত ওসমান(রা.) তার সামানপত্র খুলে সাফফুরিয়া নামক প্রসিদ্ধ এক জোড়া কাপড় বের করে তনুখির কোলের ওপর রাখলেন।
তনুখি: এই কাপড়দাতা কে?
জনৈক সাহাবি(রা.): ইনি হযরত ওসমান।
রাসূলুল্লাহ [সা.]: কে এই দূতকে মেহমান হিসেবে রাখবে?
জনৈক আনসারি সাহাবি(রা.): আমি।
[তনুখি আনসারির সাথে উঠে চলে যাচ্ছিলেন। ]
রাসূলুল্লাহ [সা.]: (ডাক দিলেন) হে তনুখি ভাই!
[তনুখি ফিরে আসলেন। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আ্লাইহি ওয়া সাল্লাম) তার পিঠ হতে চাদর সরিয়ে দিলেন। ]
রাসূলুল্লাহ [সা.]: আপনাকে যা আদেশ করা হয়েছে তা এদিকে এসে করে যান।
তনুখি রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আ্লাইহি ওয়া সাল্লাম) এর পেছনে এসে তাঁর কাঁধের নরম হাড্ডির ওপর কবুতরের ডিমের মত মোহরে নবুওয়্যত দেখতে পেলেন।
এরপর তনুখি হেরাক্লিয়াসের কাছে ফিরে আসলেন।
ছয়.
হেরাক্লিয়াসের শেষ চেষ্টা ও দুঃখজনক পরিণতি
হেরাক্লিয়াস রোমের বিশিষ্ট ব্যক্তিদের তার একটি মহলে সমবেত করলেন। তারপর তার নির্দেশে মহলের সব দরজা বন্ধ করে দেওয়া হলো। হেরাক্লিয়াস অন্দরমহল থেকে বাইরে বের হয়ে আসলেন।
হেরাক্লিয়াস: হে রোমবাসী! তোমরা কি সাফল্য ও হেদায়াত লাভ করতে চাও? তোমরা কি চাও তোমাদের এই দেশ তোমাদের হাতেই থাকুক? তবে তোমরা এই নবীর আনুগত্য স্বীকার কর।
এই কথা শুনে তারা জংলী গাধার মত দরজার দিকে ছুটল, কিন্তু দরজা বন্ধ থাকায় পালাতে সক্ষম হলো না। হেরাক্লিয়াস তাদের এই কান্ড দেখে তাদের ঈমান গ্রহণের ব্যাপারে নিরাশ হয়ে গেলেন এবং তাদের পুনরায় সমবেত করালেন।
হেরাক্লিয়াস: হে রোমবাসী! আমি এইমাত্র যা কিছু বলেছি তা শুধু তোমাদের যাচাই করার জন্য যে তোমরা আপন ধর্মের ওপর কতটুকু মজবুত রয়েছ। আমি বুঝতে পারলাম, তোমরা আপন ধর্মের ওপর খুবই মজবুত রয়েছ।
এই কথা শুনে সমবেত রোমবাসী হেরাক্লিয়াসকে সিজদা করল এবং তার প্রতি সন্তুষ্ট হয়ে গেল। সত্যের খুব কাছাকাছি এসেও, সমগ্র হৃদয় দিয়ে সত্যকে অনুধাবন করার পরও, সত্যকে গ্রহণ করার সাহসিকতা হেরাক্লিয়াস দেখাতে পারলেন না। হেরাক্লিয়াসের আর ইসলাম গ্রহণ করা হলো না।
আফসোস হে হেরাক্লিয়াস!
সমাপ্ত
[লেখাটি পুরাতন sodalap.com এ ছিল, আমার ব্লগেও প্রকাশিত হয়েছিল। নতুন সদালাপে (sodalap.org) ও রেখে দিলাম।]
সূত্রঃ
১. ইতিহাসগ্রন্থ আল বিদায়াহ ওয়ান নিহায়াহ
২. সহিহ বুখারি, দেখুনঃ [১] [২] [৩] [৪] [৫] [৬] [৭] [৮] [৯] [১০] [১১]


হাবিব হাসান শাকিল
জুন ১৭, ২০১৫ at ৩:১৮ পূর্বাহ্ণ (UTC 6) Link to this comment
ভাল লাগল। এরকম লেখা আরো চাই।
সাদাত
জুন ১৮, ২০১৫ at ৭:৩০ অপরাহ্ণ (UTC 6) Link to this comment
কেবল প্রথম পর্ব পড়ে কমেন্টটা করেছিলেন, এখন তো সবগুলো পর্ব দিয়ে দিয়েছি। আরেকবার পড়ে দেখুন।
মহিউদ্দিন
জুন ১৮, ২০১৫ at ৬:৪১ পূর্বাহ্ণ (UTC 6) Link to this comment
বাইজান্টাইন সম্রাট হেরাক্লিয়াসের ঐতিহাসিক কাহিনী বর্ণনায় চমৎকার হয়েছে এ লিখাটি। হেরাক্লিয়াসের উপর অনেক আগে আমিও " সম্রাট হেরাক্লিয়াসের সেই প্রশ্নগুলো? " শিরনামে একটি ছোট পোষ্ট দিয়েছিলাম,। ভাবছি আপনার এ লিখাটি সম্পূরক তথ্য হিসাবে আমার সে লিখায় উল্লেখ করব।
ধন্যবাদ।
সাদাত
জুন ১৮, ২০১৫ at ৭:৩৬ অপরাহ্ণ (UTC 6) Link to this comment
আপনাকেও ধন্যবাদ।
DESHEBIDESHE
জুন ১৮, ২০১৫ at ১১:২৬ পূর্বাহ্ণ (UTC 6) Link to this comment
যতদুর মনে পড়ে, মেরাজ নিয়ে হেরাক্লিয়াস এর একটি ঘটনা আছে।
সাদাত
জুন ১৮, ২০১৫ at ৭:৩৪ অপরাহ্ণ (UTC 6) Link to this comment
ভালো বিষয় মনে করেছেন তো! এই অংশটাতো খেয়াল ছিল না।
হাফিজ
জুন ১৯, ২০১৫ at ৯:১২ পূর্বাহ্ণ (UTC 6) Link to this comment
@সাদাত:
ভাই, বিষয়টা খুবই আকর্ষণীয়, পারলে এখানে যোগ করে দিন।
হাফিজ
জুন ১৯, ২০১৫ at ৯:১৪ পূর্বাহ্ণ (UTC 6) Link to this comment
ভাই, ঐ ঘটনাটাও খুব আকর্ষণীয়, পারলে এখানে যোগ করে দিন।
Faisal
জুন ১৮, ২০১৫ at ৬:২১ অপরাহ্ণ (UTC 6) Link to this comment
চিঠি তো ছিঁড়েছিল পারস্যের বাদশাহ, তাই না?
সাদাত
জুন ১৮, ২০১৫ at ৭:৩৫ অপরাহ্ণ (UTC 6) Link to this comment
জ্বি।
Rasel
জুন ২৩, ২০১৫ at ২:২১ অপরাহ্ণ (UTC 6) Link to this comment
যতদূর মনে পড়ে আবিসিনিয়ার বাদশাহ নাজ্জাসি মুসলিমদের আশ্রয় দিয়েছিলেন এবং এমনও পড়েছি যে, আল্লাহর রাসূল (স.) বাদশাহ নাজ্জাসির গায়েবানা জানাযাও পড়েছেন!
নাজ্জাসি কর্তৃক আল্লাহর রাসুলের (স.) পত্র ছিড়ার ব্যাপারটি কি একটু ক্রস চেক করবেন সাদাত ভাই?
সাদাত
জুন ২৪, ২০১৫ at ১২:২২ পূর্বাহ্ণ (UTC 6) Link to this comment
ইসলামের ইতিহাসে দুইজন নাজাশি আলোচিত। একজন হচ্ছেন যার কথা আপনি বলছেন, আরেক জন হচ্ছে যার কথা আমার লেখায় এসেছে।
হাফিজ
জুন ২৪, ২০১৫ at ২:৩৬ অপরাহ্ণ (UTC 6) Link to this comment
রসুলুল্লাহ (সা:) এর চিঠি ছিড়েছিল "খসরু", নাজ্জাসী নয়।
সাদাত
জুন ২৪, ২০১৫ at ৩:২৬ অপরাহ্ণ (UTC 6) Link to this comment
Narrated Anas bin Malik:
"Before he died, the Messenger of Allah (ﷺ) had written to Kisra, Ceasar, An-Najashi, and to every tyrant calling them to Allah. This An-Najashi is not the one that the Prophet (ﷺ) performed to the funeral Salat for."
http://sunnah.com/tirmidhi/42/29
সাদাত
জুন ২৪, ২০১৫ at ৩:৩২ অপরাহ্ণ (UTC 6) Link to this comment
খসরু বা কিসরা পত্র ছিঁড়ে ছিল নিঃসন্দেহে। কিন্তু এই তথ্য তো "নাজাশি" নামক অন্য কোন অত্যাচারীর পত্র ছিঁড়ে ফেলাকে কন্ট্রাডিক্ট করে না। আল বিদায়াহ ওয়ান নিহায়াহ-তে এই অত্যাচারী শাসক নাজাশীর কথা বলা হয়েছে। তিরমিযির হাদিস এরকম একজন নাজাশির বিদ্যমান থাকাকে সাপোর্ট করছে।
হাফিজ
জুন ২৮, ২০১৫ at ১২:০৫ অপরাহ্ণ (UTC 6) Link to this comment
হ্যা, কথাটা ঠিক, একই সাথে দুইজন চিঠি ছিড়তে পারে। তবে নাজাসী চিঠি ছিড়েছিল এমন বর্ণনা কোথাও আছে কিনা?
হাফিজ
জুন ২৩, ২০১৫ at ৯:০১ পূর্বাহ্ণ (UTC 6) Link to this comment
সাদাত,
কিভাবে সদালাপে ফরমেটিং করেন? কোনো ওপশনে যেয়ে?
হাফিজ
সাদাত
জুন ২৪, ২০১৫ at ১২:১৭ পূর্বাহ্ণ (UTC 6) Link to this comment
সদালাপে ফরম্যাটিং তো সবচেয়ে সহজ, MS Word এর মতো। আপনি নতুন একটা পোস্ট ড্রাফট করুন, বুঝতে সমস্যা হবার কথা নয়।
সানজিদ সরকার
জুলাই ৭, ২০১৫ at ১১:৫০ পূর্বাহ্ণ (UTC 6) Link to this comment
মাশাল্লাহ,সুন্দর একটি লেখা।সাধারণ মুসলিম এই বিশেয়াস স্থাপন করে যে হেরক্লিয়াস ইসলাম গ্রহণ করেছিল।কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন।
আঃছাত্তার
সেপ্টেম্বর ২৪, ২০১৫ at ৩:২১ পূর্বাহ্ণ (UTC 6) Link to this comment
সাদাত ভাই; ভালো লাগলো,