«

»

Jul ০৮

আরবরা কেন প্রেসিডেন্ট এরদোয়ানের ভক্ত

আরব বিশ্বের পশ্চিম থেকে পূর্ব পর্যন্ত সর্বত্র  খুবই জনপ্রিয় প্রেসিডেন্ট রেসেপ তায়িপ এরদোয়ান। এমনকি তুরস্কের মানুষের কাছ থেকেও বেশী জনপ্রিয় তিনি এখন আরবদের কাছে। আরবরা এরদোয়ানকে কেবল তুরস্কের রাষ্ট্রপতি নয় মুসলিম উম্মাহর নেতা হিসেবে দেখতে পায়।

গত মাসে  তুর্কি রাষ্ট্রপতি ও সংসদীয় নির্বাচনের ফলাফল উদযাপনের খুশিতে ফিলিস্তিনি শিল্পী ওসামা এসবিটা তুর্কি রাষ্ট্রপতি রেসেপ তায়িপ এরদোয়ানের প্রতিকৃতি আঁকছেন গাজায় সমুদ্র তীরে। 

তাঁর এ ব্যাপক জনপ্রিয়তার কারণ নিয়ে তাই আজ আরব মহলে প্রশ্ন ও বিতর্ক চলতে দেখা যায়। আরবরা  তুর্কি ভাষা বোঝে না এবং তুর্কি মিডিয়াও তাদের কাছে পৌছে না যে তাদের মতামতকে প্রভাবিত করতে তেমন সক্ষম হবে। তবে আরবরা এরদোয়ানের খবর এবং তার সম্পর্কের গল্প কাহিনী এমনভাবে প্রচার করে, যেন তারা উমর বিন আব্দুল আযীয, সালাহ আল-দিন বা সাইফ আদ-দীন কুতুৎসের মতো মহান মুসলিম হিরোদের গল্প বলছে। যদিও মানুষ তার সম্পর্কে যা বলে ও প্রত্যাশা করছে তার বেশিরভাগ ফ্যান্টাসি বা কাম্য চিন্তাভাবনাই বলা যায়। ফলে বিগত কয়েক দশক ধরে এমন কোন আরব বা মুসলিম নেতা পাওয়া যায় না যে কেহ এরদোগানের মত পুরা মুসলিম বিশ্বে এমন  গ্রহণযোগ্যতা পেতে সক্ষম হয়েছেন। কেউ কেউ তাকে অটোমান খলিফ হিসাবেও উল্লেখ করেছেন বা সুলতান আবদুল হামিদ দ্বিতীয়, যিনি ১৮৭৬ সন থেকে ১৯১৮ সালে তাঁর মৃত্যুর আগ পর্যন্ত অটোমান সাম্রাজ্যের শাসক ছিলেন। অনেক আরবের মনে জাগে এরদোগান এবং সুলতান আবদুল হামিদের মধ্যে যৌক্তিক সংযোগ ঐতিহাসিক উৎস থেকে । তারা দেখতে পায় অটোমানদের দ্বারা মুসলমানদের মধ্যে সম্পর্ক জোরদার করার নীতিতে সুলতান বলতেন,"আমরা বিশ্বের মুসলমানদের সাথে আমাদের সম্পর্ককে শক্তিশালী করতে চাই," এবং সুলতান আরো বলতেন " মুসলমানদের একতা ও ঐক্য ছাড়া ছাড়া ভবিষ্যতে কোন আশা নেই"। আর এরদোয়ান এই নীতিতে আজও বিশ্বাস করেন এবং সে লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছেন।

তবে কতগুলো স্পষ্ট কারণ আছে যা এরদোগানকে আরব বিশ্বে এত জনপ্রিয় করতে সাহায্য করেছে।

শুরুতে তিনি এবং তার দল ২০০২ সালে ক্ষমতায় যখন এসেছিলেন তখন থেকে তুরস্ক অর্থনীতি প্লবমান গতীতে উন্নয়ন করেছে ।

তুরস্কে মাথাপিছু আয় ২৫৯৮ ডলার থেকে ১০,০০০ ডলারে পৌছাতে সক্ষম হয়েছে।

বিগত ১৭ বছর ধরে রাষ্ট্র ক্ষমতায় থেকে এরদোগান তুরস্কের অর্থনীতিকে বিশ্বের ১৭তম উন্নত অর্থনীতির স্থানে  পৌছাতে সক্ষম হয়েছেন। তুরস্ক এখন জি টুয়ান্টির দেশে যোগদান করেছে  যা স্বাভাবিকভাবেই তার নাগরিকদের কল্যাণে এবং তাদের দৈনিক জীবনের অর্থনৈতিক উন্নয়নে  প্রতিফলিত হয়েছে।

আধুনিক তুরস্কের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো এরদোগান ও তার দল সে দেশে সামরিক শাসনের অবসান এবং জেনারেলদের আধিপত্য থেকে মুক্ত করতে সফল হন এবং অতি দ্রুত দেশে দুর্নীতির মাত্রা হ্রাস করতে সফল হয়েছেন ।

অনেক আরব দেশ এখনও সামরিক শাসনে ভুগছে এমকি সেনাবাহিনীর সাধারণ অফিসারও তার ব্যক্তিগত লাভের জন্য সরকার বা সংসদীয় সিদ্ধান্ত বাতিল করতে সক্ষম হয়।

প্রেসিডেন্ট এরদোয়ান আসেন তুরষ্কের গ্রামাঞ্চলের এক দরিদ্র ধর্মপরায়ণ পরিবার থেকে  যা অধিকাংশ আরবদের কাছে আবেদন রাখে। জীবিকার তাগিদে ও সুখী জীবন যাপনের আশায় তাঁর পরিবার ইস্তাম্বুলে চলে আসেন। যেখানে রিসেপ তাইয়্যেপ এরদোগান এক সময় রাস্তায় রুটি ও লেবু বিক্রি করতেন যাতে তিনি বাবাকে পরিবারের খরচ বহনে সাহায্যে করতে কিছু উপার্যন করতে পারেন। সেই এরদোগান এখন আধুনিক তুরস্কের সবচেয়ে শক্তিশালী নেতা। তার সমর্থকরা তাকে দেশের রক্ষাকর্তা হিসেবে দেখে থাকেন। সে তুলনায় আরবরা কখনোই এমন কোন প্রেসিডেন্ট বা শাসক দেখেনি যারা সামরিক বিপ্লবের আগে বা পরে বিলাসী  ছিলনা এবং তাদের পরিবেষ্টনী দুর্নীতিবাজ চেলা চামুন্ডারা  সর্বদা মানুষকে ভয় দেখানোর জন্য প্রস্তুত থাকে না।

তুরস্কে ৩০ হাজার সিরীয় নাগরিককে নাগরিকত্ব দেওয়া হয়েছে যারা ভোট দেবারও অধিকার পায়।

আরো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল  এরদোগান ৩.৪ মিলিয়ন সিরিয়ান শরণার্থীর জন্য তুরস্কের দরজা খোলে দেন সেই সাথে হাজার হাজার মিশরীয়, লিবিয়া, ইয়েমেন এবং অন্যান্য আরবরা জায়গা পায় যাদের জন্য তাদের দেশে বন্ধ।

তুরস্ক বর্তমানে ৭২,০০০ বিদেশী ছাত্রদের  অতিথিসেবক, যার বেশিরভাগ আরব এবং তাদের বেশিরভাগই তুর্কি সরকারের কাছ থেকে অনুদান নিয়ে পড়াশোনা করছে, যেখানে অনেক আরব দেশে তাদের সন্তানদের বিনামূল্যে শিক্ষা প্রদান করে না। গত একশ বছরে, ৮৩,০০০ আরব শিক্ষার্থী তুর্কি বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নের জন্য বৃত্তি আবেদন করেছে। কিন্তু আমরা এমন কোন আরব দেশ দেখিনা যেখানে বিদেশী ছাত্রকে অনুদানের বা অন্য কোন উপায়ে সে সব দেশে পড়ালেখা করতে আকর্ষণ করে!

তাছাড়া, আরব দেশগুলির অধিকাংশ নাগরিক কোন নিষেধাজ্ঞা বা ভিসা ছাড়া তুরস্ক প্রবেশ করতে পারেন যা আরব দেশগুলোতে সম্পূর্ণ বিপরীত।

সুদানকে তুরস্কের ৮০০ মিলিয়ন ডলারের কৃষি প্রকল্পে সহায্য করছে।

আরো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল  এরদোগান ৩.৪ মিলিয়ন সিরিয়ান শরণার্থীর জন্য তুরস্কের দরজা খোলে দেন সেই সাথে হাজার হাজার মিশরীয়, লিবিয়া, ইয়েমেন এবং অন্যান্য আরবকে জায়গা দেন যাদের জন্য তাদের দেশ বন্ধ।

তুরস্ক বর্তমানে ৭২,০০০ বিদেশী ছাত্রদের  অতিথিসেবক, যার বেশিরভাগ আরব এবং তাদের বেশিরভাগই তুর্কি সরকারের কাছ থেকে অনুদান নিয়ে পড়াশোনা করছে, যেখানে অনেক আরব দেশে এখনও তাদের সন্তানদের বিনামূল্যে শিক্ষা প্রদান করা যায় না। গত একশ বছরে, ৮৩,০০০ আরব শিক্ষার্থী তুর্কি বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নের জন্য বৃত্তি আবেদন করেছে। কিন্তু আমরা এমন কোন আরব দেশ দেখিনা যেখানে বিদেশী ছাত্রকে অনুদানের বা অন্য কোন উপায়ে সে সব দেশে পড়ালেখা করাতে এভাবে আকর্ষণ করে!

তাছাড়া, আরব দেশগুলির অধিকাংশ নাগরিক কোন নিষেধাজ্ঞা বা ভিসা ছাড়া তুরস্ক প্রবেশ করতে পারেন যা আরব দেশগুলোতে সম্পূর্ণ বিপরীত।

অবশেষে, এরদোগানের অধীন গণতান্ত্রিক তুরস্কে, সন্ত্রাসবাদ এবং সহিংসতার কাজে জড়িত থাকার অভিযোগে সিলাহাতিন ডিমিরটাস এর মত একজন বন্ধী ব্যক্তিকেও  সাম্প্রতিক রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে প্রার্থী হিসাবে দাঁড়াতে সক্ষম হতে দেখা গেলেও আরব বিশ্বে তার সম্পূর্ণ বিপরীত। সেখানে নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট হতে পারেন পরাজিত, গ্রেফতার, কারাবাস এবং জোর পূর্বক নিপাতিত! তুরস্কে একজন রাজবন্দী রাষ্ট্রপতি হয়ে উঠতে পারে,আর আরব "গণতন্ত্রতে" রাষ্ট্রপতিকে  যেতে হয় কারাবাসে এবং বাতিল করা হয় সকল ব্যালট বাক্স যেন নির্বাচন হয়েছে বা জনগণ রায় দিয়েছে এমন ঘটনাই আসলে ঘটেনি!

এই সমস্ত কারণগুলির জন্যই আরবরা এরদোয়ানকে পছন্দ করে এবং অনেক আরব এখন তুরস্কে বসবাস করতে ভিড় জমাচ্ছেন।

এ কারণে তারা গত মাসের প্রেসিডেন্ট ও সংসদীয় নির্বাচনের ঘটনা প্রবাহে ছিল আরবদের প্রচুর আগ্রহ ও উত্তেজনা যেন  আরব দেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রাজধানীগুলোতে সে নির্বাচন হচ্ছিল।

তারা কেবল সেটিকে একটি সুষ্ঠু ও ন্যায্য নির্বচন মনে করেনি বরং এ অঞ্চলের ভাগ্য নির্ধারণে তুরস্কে নির্বাচনের ফলাফল একটি বিরাট ফ্যাক্টর এবং এর গুরুত্ব অপরিসীম বলে বিশ্বাস করে। প্রেসিডেন্ট রেসেপ তায়িপ এরদোয়ান আসলেই যে বিরাট প্রভাব বিস্তার করছেন আরবদের কাছে তা স্পষ্ট প্রতীয়মান।

_________________________

বি:দ্র:
কৃতজ্ঞ প্রকাশ,এ নিবন্ধটি সংকলনে তথ্য সূত্র মিডিল ইষ্ট মনিটর ডট কম এ প্রকাশিত মোহাম্মদ এইশের লিখিত "Why the Arabs like Erdogan" প্রবন্ধের অনেকটা ভাষান্তর। 

২ comments

  1. 1

    Akbar Husain

    ১৯২৯ সালের ১লা নবেম্বর অটোমান খিলাফত ধ্বংস করা হয়। এ প্রসঙ্গে কিছু ঐতিহাসিক ঘটনার একটি সংক্ষিপ্ত ভিডিও ক্লিপ এখানে আছে।
     

  2. 2

    মোঃ ছাইফুল ইসলাম

    Middle East Monitor এন্টি-ইসলামিস্টদের (বিশেষ করে ব্রাদারহুদবিরোধী) ব্যাপক বিশ্লেষণধর্মী নিউজ মিডিয়া। আমি প্র্যায়ই এর কলামগুলো পড়ি। ধন্যবাদ সুন্দর লেখার জন্য। 

Leave a Reply

Your email address will not be published.