«

»

Jul ১৬

উয়েফা থেকে ফিফা বিশ্বকাপ: দুটি মজার অভিজ্ঞতা!

এক.

যে সময়টাতে ফুটবল খেলা সবচেয়ে বেশি উপভোগ করতাম সেই সমসাময়িক সময়ের আমার অন্যতম প্রিয় একজন খেলোয়াড় ছিল রবার্তো কার্লোস। কার্লোস-সহ সেই সময়ের আরো তিন-চার জন প্রিয় খেলোয়াড় একই সাথে রিয়্যাল মাদ্রিদে খেলার সুবাদেই হয়তো আমি রিয়্যাল মাদ্রিদের একজন ভক্ত ছিলাম। মাঝখানে অনেকদিন অবশ্য সেভাবে আর খেলা দেখা হয়ে ওঠেনি।

তবে কিছুদিন আগে উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লীগের ফাইনালে রিয়্যাল মাদ্রিদ ও লিভারপুলের মধ্যকার খেলা দেখার সুযোগ হয়। তার দু-এক দিনের মাথায় একটি পাবলিক প্লেসে বসে আছি। আমার পাশে বসা অপরিচিত দু'জন বন্ধু সেই খেলা নিয়ে আলাপ করছে। তারা আফ্রিকা কিংবা মধ্যপ্রাচ্যের কোনো দেশের হবে হয়তো। আলাপের এক পর্যায়ে একজন বলছে, "লিভারপুলে মোহামেদ সালাহ নামে একজন মুসলিম খেলোয়াড় থাকার জন্য আমি লিভারপুলকে সমর্থন দিয়েছি।"

তাদেরকে না চিনলেও তৎক্ষণাত তার দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলি, "তুমি কি জানো, রিয়্যাল মাদ্রিদের পক্ষে প্রথম যে গোলটি করেছে সেও একজন মুসলিম? তার নাম করিম বেনজেমা। শুধু তা-ই নয় - রিয়্যাল মাদ্রিদের কোচ জিনেদিন জিদানও একজন মুসলিম, সর্বকালের সেরা খেলোয়াড়দের একজন, এবং তার নেতৃত্বে ১৯৯৮ সালে ফ্র্যান্স বিশ্বকাপ জিতেছে।" আমার কথাগুলো শুনে সে কিছুটা ভরকে যায়। কিছু বলার আগেই তাকে আরো অবাক করে দিয়ে বলি, "তুমি সম্ভবত লক্ষ্য করো নাই যে, লিভারপুলের পক্ষে একমাত্র গোলটি যে করেছে সেও একজন মুসলিম। তার নাম সাদিও মানে।"

সে ব্যাপারটা বুঝতে পেরে বলে, "স্যরি! স্যরি! ওভাবে বলা হয়তো ঠিক হয় নাই!"

 

দুই.

এবারের ফিফা বিশ্বকাপ খেলা চলছে। ১ম ও ২য় রাউন্ডের কোনো খেলা দেখা হয়নি। সত্যি বলতে, সেমি ও ফাইনাল-সহ মোটেই ৪টি খেলা দেখেছি। তবে খেলার খবরা খবর রাখছিলাম। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে, এবারের বিশ্বকাপের মূল পর্বে ৩২টি দেশের মধ্যে ৭টি (২২%) মুসলিম-অধ্যুষিত দেশ ছিল। কিন্তু তাদের কেউই দ্বিতীয় রাউন্ডে যেতে পারেনি। সর্বশেষ দেশ সেনেগালের সাথে জ্যাপানের পয়েন্ট এবং গোল-ব্যবধান সমান হওয়া সত্ত্বেও হলুদ কার্ডের ফেরকায় পড়ে সেনেগালও বাদ পড়ে যায়।

সেনেগালের বাদ পড়ার খবর নিশ্চিত হওয়ার পর আমাদের প্রতিবেশী ধর্মের একজন অনুজ বন্ধু আমাকে উদ্দেশ্য করে বলে, "আপনারা তো বিশ্বকাপ থেকে আউট হয়ে গেলেন! হিহিহি!" আমি তার কথার অন্তর্নিহিত অর্থ বুঝতে না পেরে তাকে প্রশ্ন করি, "এখানে "আপনারা" মানে ঠিক কারা?" এই প্রশ্নে সে খানিকটা লজ্জিত হয়ে বলে, "না থাক। একটু মজা করলাম আরকি।" আমি কিছুটা জোরাজুরি করাতে সে বলে, "না মানে, সবগুলো মুসলিম দেশ প্রথম রাউন্ড থেকে বাদ পড়ে গেল তো!"

সে এই তথ্য দেওয়ার আগে আমি সেভাবে ভেবে দেখিনি। তার খোঁচার অর্থ বুঝতে পেরে তাকে বললাম, "১মত- আমি একটা সময় পর্যন্ত ব্রাজিলের সমর্থক ছিলাম। তবে বিগত কয়েকটা বিশ্বকাপে নির্দিষ্ট কোনো দলকে আর সমর্থন দেইনি। এবারেও না। তাছাড়া ব্রাজিলের খেলা আগের মতো আর ভালো লাগে না। ২য়ত- মুসলিম-অধ্যুষিত সবগুলো দেশ প্রথম রাউন্ড থেকে বাদ পড়েছে- এই তথ্যটা সত্য। তবে মুসলিম খেলোয়াড়রা বিশ্বকাপ থেকে বাদ পড়ে যায়নি কিন্তু।" তার তড়িত প্রশ্ন, "কীভাবে?" আমি বললাম, "এবারের ফেভারিট বেলজিয়াম দলের ২৩ জনের স্কোয়াডে ৪ জন (১৭%) মুসলিম খেলোয়াড় আছে। আরেক ফেভারিট ফ্র্যান্স দলের ২৩ জনের স্কোয়াডে ৭ জন (৩০%) মুসলিম খেলোয়াড় আছে। এই দুই দলই কিন্তু দ্বিতীয় রাউন্ডে উঠেছে।" এর পর সে আর কোনো কথা না বাড়িয়ে নীরবে কেটে পড়ে! 

যাইহোক, এই পোস্ট'টা যখন লিখছি তখন ফ্র্যান্স ইতোমধ্যে চ্যাম্পিয়ন হয়েছে। আর বেলজিয়াম তৃতীয় স্থান পেয়েছে। এই দুই দলের স্কোয়াডে মোট ১১ জন (২৪%) মুসলিম খেলোয়াড় আছে।

ফাইনালে ফ্র্যান্সের ১১ জনের টিমে ৩ জন (২৭%) মুসলিম খেলোয়াড় ছিল (Paul Pogba, N'Golo Kanté, Nabil Fekir)। তাছাড়াও এই দলের তরুণ সেনসেশন কিলিয়ান এমবাপ্পের ধর্মীয় বিশ্বাস সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া না গেলেও তার মা একজন মুসলিম। মা-এর সূত্রে কিলিয়ান এমবাপ্পেকে ধরলে মোট ৪ জন (৩৬%) মুসলিম হয়। ফ্র্যান্সের পক্ষে ৪টি গোলের মধ্যে একটি ছিল আত্মঘ্যাতী। বাকি ৩টি গোলের একটি দিয়েছে অ্যান্টোনিও গ্রীজম্যান, পেনাল্টি কিক থেকে। বাদবাকি দুটি গোলের একটি দিয়েছে রক্ষণভাগের সেরা খেলোয়াড় পল পগবা - যে একজন মুসলিম। শেষের গোলটা দিয়েছে কিলিয়ান এমবাপ্পে - যার মা একজন মুসলিম।

কাজেই - টেকনিক্যালি - মুসলিম-অধ্যুষিত একটি দল এবারের বিশ্বকাপ জিতেছে বললে বড় ধরণের কোনো ভুল বলা হবে বলে মনে হয় না। আর তৃতীয় স্থান পাওয়া বেলজিয়ামেও মুসলিমদের অবদান আছে। ফ্র্যান্সের এই বিশ্বকাপ দলের আরো একটি বিশেষত্ব হচ্ছে এটি ইউরোপের একমাত্র কৃষ্ণাঙ্গ-অধ্যুষিত দল।

আমার সেই বন্ধুকে অবশ্য পাল্টা খোঁচা দিয়ে বলা হয়নি, "তোমরা কিন্তু এ পর্যন্ত একটি বারের জন্যও ফিফা বিশ্বকাপের মূল পর্বে যেতে পারো নাই। আগামী ১০০ বছরেও পারবা কিনা সন্দেহ। এমনকি বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন দল বা ক্লাবগুলোরও কোনোটাতেই তোমাদের কোনো খেলোয়াড় নেই। অথচ সৌদি আরব ও ইরানের মতো দেশও এ পর্যন্ত ৫ বার করে বিশ্বকাপের মূল পর্বে খেলেছে।"

২ comments

  1. 1

    মোঃ তাজুল ইসলাম

    ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা একজন ফুটবলার রবার্তো কার্লোস। আমার মতে, সে সেরাদের সেরা। 

    বিশ্বে যে কয়কটি দেশের মানুষ বেশি ইসলাম গ্রহণ করছেন তার মধ্যে ফ্রান্স অনেক এগিয়ে আছে। ফ্রান্সের লোকজন ইসলাম গ্রহণ করছেন অধিক হারে। 

    ধন্যবাদ পোস্টের জন্য।  

  2. 2

    সুজন সালেহীন

    আমাদের প্রতিবেশী ধর্মের একজন বুড়ো বরেণ্য বলিউড অভিনেতা অবশেষে ফিফা বিশ্বকাপ ২০১৮ জিতেছে আফ্রিকা বলে এক বিদ্রূপাত্মক টুইট করেছে! 

Leave a Reply

Your email address will not be published.