[লেখাটা গল্প আকারে লিখলেও এতে ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটের অনেক কিছুই এসেছে। তাই এতে ইতিহাস ও গল্পের মিশ্রণ আছে। যতটা সম্ভব সময়ক্রম ও ঘটণা ঠিক রাখতে চেষ্টা করেছি। আমি গল্পের আকারে চাচ্ছি বোসনের একটা ইতিহাস দাঁড় করাতে। এর মাঝেই সংশ্লিষ্ট বিজ্ঞান বিষয়ে আলোকপাত করার চেষ্টা থাকবে।]
ইউনিফাইড ফিল্ড থিওরি, প্রাকৃতিক বল গুলোকে একীভুত করার চেষ্টা
সকালে উইলহ্যাম ইন্সটিটিউটে ভালো আড্ডা জমলো সত্যেন আর আইনষ্টাইনের মধ্যে। আইনষ্টাইন এর মধ্যে ইউনিফাইড ফিল্ড থিওরি নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করা শুরু করেছেন। তিনি ভাবছেন, বিদ্যুত-চৌম্বকীয় আর মহাকর্ষ বল যেহেতু প্রকৃতিতে দেখা যাওয়া দুটো বল, সুতরাং নিশ্চয়ই তারা কোনভাবে একই সুত্রে গাঁথা; তাই তাদের নিশ্চয়ই একই ফ্রেমওয়ার্কে এনে একটা সাধারণ সমীকরণ দিয়ে প্রকাশ করা যাবে। সত্যেনকে তার রুমে আসতে দেখে তিনি বললেন,
-“ভালোই হলো বোস সকালে দেখা হয়ে গিয়ে। তোমার সাথে কিছুক্ষণ আড্ডা দেয়া যাক। তুমি জানো নিশ্চয়ই যে আমি ইউনিফাইড ফিল্ড থিওরি নিয়ে ভাবছি।”
-“আপনি যে প্রাকৃতিক বল গুলোকে একীভুত করার চেষ্টা করছেন সবাই তা জানে; আর আমিও তার ব্যতিক্রম নই। আচ্ছা সংক্ষেপে বলুন তো কেন আপনি ভাবছেন যে বিদ্যুত-চৌম্বকীয় আর মহাকর্ষ বলকে একই ফিল্ড ইকুয়েশনের মাধ্যমে প্রকাশ করা যাবে?”
-“হুম তাহলে তো ইতিহাসের পাতাতে যেতে হয়। এইতো ৬০-৭০ বছর আগেও আমরা বিদ্যুৎ আর চুম্বকের বলকে আলাদা ভাবে দেখতাম; তাই না? আমরা জানতাম একই মেরুর চুম্বক বিকর্ষণ বল প্রয়োগ করে আর বিপরীত মেরুর হলে সেই বল হয়ে যায় আকর্ষণ। বিদ্যুতের বেলাতেও তাই। কিন্তু যখন ফ্যারাডে দেখলেন যে পরিবর্তনশীল চৌম্বক ক্ষেত্রে কোনো কন্ডাক্টর থাকলে তাতে বিদ্যুৎ প্রবাহ দেখা যায়, আর অন্যভাবে দেখলে, বিদ্যুৎ ক্ষেত্রে থাকা কম্পাস কাঁটা বিক্ষিপ্ত হয়; তখন থেকেই বিজ্ঞানীরা ধারণা করেন যে বিদ্যুৎ আর চুম্বকের দেখানো বল কোনোভাবে পরষ্পরের সাথে সম্পর্কিত…”
-“যতক্ষন না ম্যাক্সওয়েল একসেট সমীকরণের মাধ্যমে তাদের সংযুক্ত না করলেন, তাইতো…”
-“কাকে কী বলছি! তোমার তো এসব ইতিহাস জানার কথা। আসলে অনেক দিন অধ্যাপনা করেছি তো; তাই সবাইকে ছাত্র মনে হয়। যাইহোক, একেবারে ঠিক কথা বলেছ বোস। আর জেমস ম্যাক্সওয়েল আমার নিজের অনুপ্রেরণার এক মহান উৎস। জানোই তো নিশ্চয়ই উনার সমীকরণ থেকে বের করা যায় যে ইলেকট্রো-ম্যাগনেটিক তরঙ্গের বেগ আলোর বেগের সমান। আর তখন থেকে আলোই যে আসলে ইলেকট্রো-ম্যাগনেটিক তরঙ্গ পরিবারের সদস্য তা সবার মধ্যে প্রোথিত হয়।”
-“হ্যাঁ তার কিছুকাল পরেই তো মাইকেলসন আর মর্লি একসাথে প্রমাণ করলেন ইথার বলে কিছু নেই, আলো আসলে সূর্য থেকে পৃথিবীতে আসে ভ্যাকুয়ামের মধ্যে দিয়ে।”
-“আলবৎ!! আর সাথে আরেকটা ব্যাপার ভেবে দেখ, মাইকেলসন আর মর্লি যেভাবেই পরীক্ষা করেন না কেন আলোর বেগ পাচ্ছেন একই রকম, অন্যদিকে ম্যাক্সওয়েলের সমীকরণ বলছে আলোর বেগ কেবল মাধ্যমের পারমিটিভিটি আর পারলিয়েবিলিটির উপর নির্ভর করছে, যারা ধ্রুবক অর্থাৎ সময়ের সাথে অপরিবর্তনীয়। মাইকেলসন আর ম্যাক্সওয়েলের পরীক্ষাই কিন্তু আমাকে সাধারণ আপেক্ষিকতার জন্যে আলোর বেগকে ধ্রুব ধরতে সাহস যুগিয়েছে।”
চিত্র ১: ম্যাক্সওয়েল, মাইকেলসন ও মর্লি
-“হুম এবার বুঝলাম, কেন আপনি আলোর বেগকে ধ্রুব ধরেছেন আর কেনই বা আপনি ইউনিফাইড ফিল্ড থিওরি নিয়ে ভাবছেন। মানে ম্যাক্সওয়েল যেভাবে বিদ্যুৎ আর চুম্বকের প্রদর্শিত বলেক একীভুত করলেন, সেভাবে আপনি ভাবছেন যে অন্য প্রাকৃতিক বল গ্র্যাভিটিকেও ইলেক্ট্রো-ম্যাগনেটিক বলের সাথে একীভুত করা যাবে, তাইতো।”
-“অবশ্যই তাই। আর দেখ আপেক্ষিকতার সাধারণ তত্ত্বেও দেখলাম যে গ্র্যাভিটেশনাল ওয়েভের বেগ আলোর বেগের সমান। তাই তারা যে একই ফ্রেমে আবদ্ধ এটা আমার কাছে অন্তত একটা স্বাভাবিক ইন্টুইশন। যাকগে বোস, তুমি কী কালুজার পেপারের কথা শুনেছ?”
-“না স্যার শুনিনি। ব্যাপারটা কেমন?”
-“তোমার চিঠি যেমন হঠাৎ পেলাম এই দু বছর আগে, তার আগে তুমি মোটামুটি অপিরিচিতই ছিলে আমার কাছে; কালুজার ক্ষেত্রেও তেমনই ঘটনা ঘটেছে, তবে তা ঘটে তোমার সেই চিঠি পাবার আরো বছর পাঁচেক আগে; ১৯১৯ সালে। কালুজা কনিগসবার্গের এক উইনিভার্সিটিটে ম্যাথ পড়ায়। ও একটা অসাধারণ কন্সেপ্ট নিয়ে একটা চিঠি দিল আমাকে। সে দেখালো যে আমাদের পরিচিত স্থানের ডাইমেনশন একটা মাত্রা বাড়িয়ে চতুর্মাত্রিক স্থান আর সময়ের একটা মাত্রা নিয়ে পঞ্চমাত্রিক স্থান-কালের পরিপ্রেক্ষিতে যদি সাধারণ আপেক্ষিকতার সুত্রগুলোকে সাধারনকৃত (generalized) করা হয়, তাহলে এক অভাবনীয় ফলাফল পাওয়া যায়।”
-“বড়ই ইন্টারেস্টিং!!! কী রকম ফলাফল পাওয়া যায় সেক্ষেত্রে?”
-“স্বভাবতই স্থানের তিনটা মাত্রাতে আমার সাধারণ আপেক্ষিকতার সুত্রগুলি বের হয়ে আসে, আর স্থানের অবশিষ্ট মাত্রা, অর্থাৎ চতুর্থ মাত্রা সমীকরণে যোগ করাতে আরো একসেট অতিরিক্ত সমীকরণ বের হয়ে আসে। আর ঐ সমীকরণ আর কিছুই না; ওটা আমাদের অতি পরিচিত ম্যাক্সওয়েলের ইলেকট্রোম্যাগনেটিক ফোর্সের সমীকরণ।”
-“আশ্চর্য তো!!! আপনি তো তাহলে ইউনিফিকেশনের ফ্রেমওয়ার্ক পেয়ে গেলেন। কোনো কারণের কালুজার কথা আমি কখনো শুনিনি! এবার একটু পড়ে দেখতে হবে সময় নিয়ে। তো আপনি কী কালুজার দেখানো পদ্ধতিতে এগুনোর কথা চিন্তা করছেন?”
-“কোনো তো সন্দেহ নেই যে কালুজার দেখানো স্থান-কালের নতুন আঙ্গিকে আমরা গ্র্যাভিটিকে ইলেক্ট্রো-ম্যাগনেটিক ফোর্সের সাথে যুক্ত করতে পারছি; কিন্তু প্রশ্ন হলো এটা কী নিছকই অঙ্কের কাকতালীয় ভেল্কি, নাকি আসলেই এতে প্রকৃতির কোনো গূঢ় রহস্য লুকিয়ে আছে? আর কালুজার ফ্রেমওয়ার্কের সবচেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে, স্থানের চতুর্থ মাত্রা আছে এই কথার মানেটা কী? আমরা তো তিনটা মাত্রা দেখছি। তাহলে চতুর্থ মাত্রা কোথায় আছে? এটাকে দেখা যাচ্ছে না কেন? আসলে এই মৌলিক প্রশ্ন থেকে যাওয়াতে; অনেক পদার্থবিদ কালুজার প্রস্তাবকে সিরিয়াসলি নেয়নি। তারা ভেবেছেন, এটা নিছক অঙ্কের কাকতালীয়তা; আর এর সাথে আমাদের দেখা মহাবিশ্বের মৌলিক বিধিগুলোর কোন সম্পর্ক নেই। আর তোমার পেপারটার মতোই ওর পেপারটা জার্নাল কতৃপক্ষ ছাপাতে চায়নি; পরে আমার কাছে চিঠি দিল কালুজা। আর আমি রিকমেন্ড করাতে একটা ফিজিক্স জার্নাল পেপারটা ছেপেছে। ব্যপারটা অনেকটা তোমার সিচুয়েশনের মতো।”
কালুজার বিষয়টা সত্যেনকে বেশ উদ্বেলিত করলো। পরে কিছুদিন সে বিষয়টা নিয়ে পড়াশুনা করলো। এদিকে খবর পাওয়া গেলো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপকের একটা পদ খালি হয়েছে। সত্যেনের বন্ধু-বান্ধবরা তাকে অধ্যাপক পদে আবেদন করার জন্যে পীড়াপিড়ি করা শুরু করে দিল। সত্যেনের ডক্টরেট ডিগ্রি নেই। সর্বোচ্চ ডিগ্রি ছাড়া অধ্যাপকের পদ পাওয়া যাবে বলে মনে হয়না। সে ঠিক করলো আইনষ্টাইনের সাথে এ নিয়ে পরামর্শ করবে। ঐদিকে আবার সেদিন সকালেই সত্যেনের চোখে পড়ে গেলো সুইডিশ পদার্থবিদ অস্কার ক্লেইনের একটা পেপার। সে কালুজার প্রস্তাবিত চতুর্থ মাত্রার ব্যাখ্যা দিয়ে পেপারটা লিখেছে। ক্লেইন লিখেছেন, স্থানের চতুর্থ মাত্রা যার কথা কালুজা বলেছেন সেটা আসলে আমাদের দেখা চিরায়ত তিনটি মাত্রার চেয়ে অনেক-অনেক ছোটো আর প্যাঁচানো। স্থানের ঐ মাত্রাটি এতই ছোট যে তা খালি চোখে দেখা যায়না। পেপার পড়ার সাথে সাথে মনে হলো গুরুকে বিষয়টা জানানো দরকার। তৎক্ষণার সত্যেন হাজির হলে আইনষ্টাইনের রুমে। সত্যেন বললেন,
-“আপনি কী অস্কার ক্লেইনের পেপারটা দেখেছেন? উনি তো কালুজার চতুর্থ মাত্রার ব্যাখ্যা দিয়েছেন একটা!!!”
-“তাই নাকি; কেমন বলতো সংক্ষেপে।”
সত্যেন পড়া আর্টিক্যাল-টার মর্মার্থ জানালেন আইনষ্টাইনকে। সব শুনে আইনষ্টাইন বললেন, “হুম, ভালোই ব্যাখ্যা। তবে ভালো করে পড়ে দেখতে হবে পেপারটা, আর অস্কারের সাথেও একটু যোগাযোগ করতে হবে দেখি।”
চিত্র ২: থিওডর কালুজা ও অস্কার ক্লেইন
এই বিষয়ে আলোচনা শেষ হলে সত্যেন বললেন,
-“স্যার, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে তো অধ্যাপকের একটা পদ খালি হয়েছে। আবেদন করবো কিনা একটু পরামর্শ দেবেন।”
-“কেন আবেদন করো, অসুবিধা কী?”
-“না, মানে, আমার তো আর পিএইচডি করা হয়নি; তাই ভাবছি ঐ পদে আবেদন করলে আমাকে নেয়া হবে কিনা?”
আইনষ্টাইন বললেন, “তুমি এই বিষয়ে এত দক্ষ আর পারদর্শী; এজন্যে কী আর কোনো সার্টিফিকেটের দরকার আছে?”
আইনষ্টাইন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বরাবর লিখলেন, “আপনারা কী সত্যেন্দ্রনাথ বোসের চাইতে আরো যোগ্য বিজ্ঞানী খুঁজে পাবেন? বোসই ঐ পদের জন্যে যোগ্য ব্যাক্তি।”
বার্লিনে সত্যেনের সময় শেষ হয়ে এসেছে। মনটাও দেশের জন্যে কাঁদছে বেশ। ১৯২৬ সালের ডিসেম্বরে সত্যেন ঢাকাতে ফিরে এলেন।
১৯২৭-১৯৫৫, দেশ ভাঙ্গলো, মন ভাঙ্গলো, চললো যুদ্ধ একাকী
ঢাকায় ফিরে সত্যেন যোগ দিলেন কাজে। বিভাগীয় প্রধাণ থেকে শুরু করে হলেন বিজ্ঞান অনুষদের ডীন। ফাঁকে ফাঁকে চালিয়ে যেতে লাগলেন গবেষণার কাজ। শুরু হলো দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ। যুদ্ধ শেষে দেশ যে অবধারিত ভাবে ভেঙ্গে যাবে তা সত্যেন বেশ অনুমান করতে পারছেন। কতো দীর্ঘ সময় কাটিয়েছেন সত্যেন ঢাকা সহ পূর্ব বাংলার প্রত্যন্ত অঞ্চলে। সেই প্রায় ২৫ বছর আগে সত্যেন সপরিবারে এসেছিলেন নির্জন ঢাকায়, চোখেমুখে স্বপ্ন ছিল পিছিয়ে থাকা পূর্ব বাংলাকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া, যে প্রত্যয় তিনি পেয়েছেন মনে প্রাণে বঙ্গভঙ্গের বিরোধিতায়। অনেকেই বঙ্গভঙ্গের বিরোধিতা করেছেন, বিশেষত কংগ্রেসের রাজনীতিবিদেরা। আন্দোলনের সেই উত্তাল দিনগুলোতে তারা বলতেন, এক বাংলাকে ছুরি দিয়ে কেটে ফেললে ছুরির আঘাতে অন্তরে রক্তক্ষরণ তো হবেই। কিন্তু নেতাগোষ্ঠী কিংবা আম-জনতার কেউই সেদিনের দৃপ্ত শপথের পথে চলেননি। সবাই ছুটেছে পশ্চিমে; হয় কোলকাতা, নয় দিল্লী নয় আরো পশ্চিমে ইউরোপ কিংবা যুক্তরাষ্ট্রে। তার প্রিয়তম বন্ধু পূর্ব বাংলার মেঘনাদও সেই যে বাংলা ছাড়লো, আর ফিরে এলোনা। কেবল সত্যেন এসেছেন ঢাকাতে, স্রোতের বিপরীতে, পশ্চিমে জন্মেও তিনি একাকী চলেছেন পূর্বদিকে। এসেছেন পূবে কেননা বাংলার সুষম উন্নতির স্বপ্ন মিশে আছে তার শোণিত প্রবাহে, তার প্রতিটি নিঃশ্বাসে। কিন্তু এখন তিনি বড়ই মর্মাহত; প্রায় ২৫ বছর পরে তাকে ফিরে যেতে হচ্ছে কোলকাতায়, আর তার স্বপ্নের বাংলা আসলেই ছিঁড়ে দু-টুকরো হতে বসেছে। ১৯৪৫ সালের মাঝামাঝি অসম্ভব ভাঙ্গা হৃদয় নিয়ে সত্যেন ফিরে গেলেন কোলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিদ্যা বিভাগে।
ঐদিকে আইনষ্টাইনের জীবনেও নেমে আসছে এক অন্ধকার অধ্যায়। জার্মানীতে নাৎসী দল ক্ষমতায় এসেছে। আর তারা একের পর এক ইহুদি বিদ্বেষী আইন করে চলেছে। তিনি বুঝতে পারলেন, কেবল ইহুদি হবার কারণে তার ভবিষ্যতে আঁধার ছাড়া আর কিছুই নেই। তিনি এক লেকচার ট্যুরে বেরিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রে ১৯৩৩ সালে। সেই ট্যুরই হলো জার্মানী থেকে তার চির নির্বাসনের শেষ যাত্রা। তিনি আর জার্মানী ফিরে গেলেন না। পেয়ে গেলেন প্রিন্সটন ইউনিভার্সিটির ইন্সটিটিউট অব অ্যাডভান্সড স্টাডি’তে একটা স্থায়ী পদ। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত আইনষ্টাইন প্রিন্সটনেই ছিলেন।
এদিকে কোয়ান্টাম মেকানিক্স আস্তে আস্তে পাখা মেলে আধুনিক মেকানিক্সের অন্যতম অংশ বলে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করলো। আইনষ্টাইন ছিলেন ক্লাসিক্যাল মেকানিক্সে বিশ্বাসী, কোয়ান্টাম মেকানিক্সের সম্ভবনার প্রস্তাবনা তিনি তেমন ভাবে কখনোই মেনে নিতে পারেননি। যুক্তরাষ্ট্রে থাকা শেষ ২০-২২ বছর তিনি প্রায় একাই চেষ্টা করেছেন ইউনিফাইড ফিল্ড থিওরির মাধ্যমে মহাকর্য আর ইলেক্ট্রো-ম্যাগনেটিক ফোর্সকে একীভুত করতে; কিন্তু তিনি তা পারেননি। কালুজা-ক্লেইনের তত্ত্ব অনুসারে তিনিও এগিয়েছেন কিছুটা, কিন্তু সময়ের সাথে তত্ত্বে অনেক অসম্পূর্ণতা দেখা দিল। যেমন, কালুজা-ক্লেইনের ফ্রেমওয়ার্কে ইলেক্ট্রকে ভালোভাবে বাঁধা গেলোনা; আর সেই সাথে তো চতুর্থ মাত্রার ব্যাখ্যাও প্রশ্নসাপেক্ষে থাকলো, কেননা পরীক্ষাগারে প্রমাণিত হবার আগে এটা তাত্ত্বিক পর্যায়েই থেকে যাবে।
ইউনিফাইড ফিল্ড থিওরি নিয়ে আইনষ্টাইনের বাইরে খুবই কম বিজ্ঞানী কাজ করেছেন। অবশ্য সেই অল্প সংখ্যক বিজ্ঞানীর মধ্যে আছে সত্যেন। ৫০ এর দশকে সত্যেন ইউনিফাইড ফিল্ড থিওরি নিয়ে বেশ কয়েকটা পেপার লেখেন। বার্লিন ছাড়ার পর থেকে সত্যেনের সাথে আর আইনষ্টাইনের দেখা হয়নি কোথাও, তবে চিঠির মাধ্যমে যোগাযোগ ছিল নিয়মিত। তবে ১৯৫৫ সালে এক পেপার নিয়ে আইনষ্টাইনের সাথে আলাপ করার সুযোগ এসে গেলো। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের ভিসার আবেদন করলেন। অনেক দিন পরে বসের সাথে দেখা হবে এই উদ্দীপনা নিয়ে ইউনিফাইড ফিল্ড থিওরি নিয়ে করা নতুন পেপারটাকে বেশ ঘষামাজা করে ঠিক করে নিলেন। কিন্তু এমন সময় খবর এলো, আইনষ্টাইন পৃথিবী ছেড়ে চলে গেছেন। মনের দুঃখে সত্যেন ছিঁড়ে ফেললেন পেপারটা। আর এই মহাপ্রয়ানে তার হৃদয় চঞ্চল থাকলো অনেকদিন।
(…চলবে…)



সত্তুক
জানুয়ারি ১৫, ২০১২ at ১:১৬ অপরাহ্ণ (UTC 6) Link to this comment
খুব সুন্দর মিহি ভাবে এগুচ্ছে, চলুক, চলতেই থাকুক।
শাহবাজ নজরুল
জানুয়ারি ১৭, ২০১২ at ৭:২১ পূর্বাহ্ণ (UTC 6) Link to this comment
আশা করি 'মিহি'র মাধ্যমে compliments ই জানালেন … তবে চলতেই থাকবে না, আশা করি আর ২-১ পর্বের মধ্যে এটা শেষ করবো; নাইলে আবার আমার পর্ব শেষ হবার আগেই হয়ত শুনবেন সার্ণে হিগস পাওয়া গেছে already, আর তাহলে শিরোনামের আর তাৎপর্য থাকবেনা …
সাথে থাকুন…
এস. এম. রায়হান
জানুয়ারি ১৫, ২০১২ at ৯:০৯ অপরাহ্ণ (UTC 6) Link to this comment
মাঝখানে পড়ার গ্যাপ হয়ে গেছে। তবে শেষ পর্যন্ত দেখতে চাই। পরে সময় করে পড়ব।
জানুয়ারি ১৭, ২০১২ at ৭:২৩ পূর্বাহ্ণ (UTC 6) Link to this comment
আল্লাহর ইচ্ছা থাকলে ইনশাল্লাহ ২-১ টা পর্বের মধ্যে শেষ করবো। পড়ে নেন পারলে সময় করে। বেশ গবেষণা করে লিখছি পর্বগুলো…; তাই পাঠক পড়লে আনন্দ পাই।
বুড়ো শালিক
জানুয়ারি ১৬, ২০১২ at ৬:১৩ অপরাহ্ণ (UTC 6) Link to this comment
চলুক। ভালো লাগছে।
এই পর্বে কিছু বানান ভুল আছে। ঠিক করে দিলে ভালো হয়। আরেকটা বড় ব্যাপার: 'আইনস্টাইন' বানান দন্ত্য-স দিয়ে, মূর্ধন্য-ষ দিয়ে না।
শাহবাজ নজরুল
জানুয়ারি ১৭, ২০১২ at ৭:৩০ পূর্বাহ্ণ (UTC 6) Link to this comment
সাথে থাকার জন্যে ধন্যবাদ।
একটু সাজেস্ট করেন বানান ভুলগুলো; শুধরে নেব ইনশাল্লাহ। আইন্সটাইন (কিংবা আইনষ্টাইন) লেখার সময় proper noun এর নীতিতে উপহার দেয়া বানান বেছে নেবার স্বাধীনতা নিলাম। আমি সবসময় এভাবেই বানানটা লিখেছি। আর এমন বানান অন্যরাও ব্যবহার করেন দেখেছি।
শাহবাজ নজরুল
জানুয়ারি ১৭, ২০১২ at ৯:০৭ পূর্বাহ্ণ (UTC 6) Link to this comment
বুড়ো সাহেব, আপনার লেখা মিস করছি অনেকদিন। কী হলো আপনার?? পরবর্তী লেখা কখন দেবেন? প্রোগ্রামিং এর উপর সিরিজটা তো ভালোই চলছিল। তাড়াতাড়ি কিছু ছাড়েন দেখি।
বুড়ো শালিক
জানুয়ারি ১৯, ২০১২ at ১:১০ অপরাহ্ণ (UTC 6) Link to this comment
আসলে ইদানিং একটু ব্যস্ত সময় যাচ্ছে। সময় পেলে অবশ্যই লিখবো…
শামস
জানুয়ারি ১৬, ২০১২ at ৬:৫৬ অপরাহ্ণ (UTC 6) Link to this comment
ভাবছিলাম সময় করে পড়ে পড়ব। কিন্তু পড়তে গিয়ে এক নিমিষে শেষ করে ফেললাম। অসাধারণ হয়েছে পর্বটা।
আলোর বেগ যে কেন ধ্রুব ধরা হয় তা খুব দারুণভাবে প্রকাশ করেছেন! গ্রাভিটন কনিকার বেগে আলোর বেগের চেয়ে অনেক বেশী তা যদি বিজ্ঞানে স্থান করে নেয় তাহলে কি গ্রাভিটনের বেগ 'ধ্রুব' ধরা যাবে? আর আরেকটি কথা, যে পারমিয়েবিলিটি ও পারমিটিভিটির স্থিরতার উপর নির্ভর করে আলোর বেগকে ধ্রুব ধরা হয়েছিল সেই ধারণাটাও তাহলে ঠিক না, আরো কিছু অজানা প্যারামিটার থাকতে পারে!!!
গ্রাভিটেশনাল ওয়েভ এর ব্যাপারটা একটু ব্যাখ্যা করবেন!
ধন্যবাদ।
শাহবাজ নজরুল
জানুয়ারি ১৭, ২০১২ at ৭:১২ পূর্বাহ্ণ (UTC 6) Link to this comment
এখন পর্যন্ত আপনাদের মতো কিছু সিরিয়াস গোছের পাঠক আছে দেখে ভালো লাগলো। বেশ গবেষণা করে পর্বগুলো লিখতে হচ্ছে। সাথে থাকুন।
এখন পর্যন্ত যে কয়েকটা তত্ত্ব আছে গ্র্যাভিটন কণাকে গাণিতিকভাবে মডেল করার কিংবা একে ভবিষ্যতে ডিটেক্ট করার তার কোনোটাতেই একে আলোর বেগের চাইতে বেশী ধরে করা হয়নি। সব মডেলেই গ্র্যাভিটনের বেগ আলোর বেগের সমান। আরেকটা ইম্পর্ট্যান্ট ব্যপার, হিগস বোসন যদিও এই বছরের মধ্যেই ডিটেক্ট করার সম্ভবণা আছে সার্ণে, কিন্তু অপর অনাবিষ্কৃত বোসন, অর্থাৎ গ্র্যাভিটনের ডিটেকশনের কোনো পরীক্ষা অদুর ভবিষ্যতেও হবে কিনা সন্দেহ আছে। কেননা, গ্র্যাভিটি অত্যন্ত দূর্বল বল। এক হিসেবে দেখা গেছে, গ্র্যাভিটন ডিটেক্টর যদি পৃথিবীর সমান হয় তবে সে ডিটেক্টরে ১০ বছর ধরে অনবরত পরীক্ষা চালালে, ১ টি গ্র্যাভিটন কণা ডিটেক্ট করার সম্ভবনা আছে। অতএব, গ্র্যাভিটনের প্রমাণ হয়তো অন্য কোনো প্রস্তাবিত পরীক্ষণের মাধ্যমে হবে। গ্র্যাভিটন গত পর্বে বলা স্ট্যান্ডার্ড মডেলে নেই। একে রাখা হয়েছে কোয়ান্টাম গ্র্যাভিটি ও স্ট্রিং থিওরি জাতীয় তত্ত্বে। স্ট্রিং থিওরির ব্রেইন ওয়ার্ড কসমোলজি তে গ্র্যাভিটি কেন এত দূর্বল তার ব্যাখ্যা দেয়া হয়। কিন্ত বর্তমানে স্ট্রিং তত্ত্ব নিজেই অসম্পূর্ণ, আর এটা তত্ত্ব পর্যায়েই আছে, অর্থাৎ এটি এখনো পরীক্ষাগারে প্রমাণিত হয়নি। তবে এর প্রথম ইন-ডিরেক্ট প্রমাণ পাবার সম্ভবনা আছে সার্ণের LHC তে। আমরা সেজন্যে অপেক্ষা করতে থাকি।
পারমিয়াবিলিটি আর পারমিটিভিটি আসলে কোনো মাধ্যামের মধ্যে চৌম্বক আর বিদ্যুৎ ক্ষেত্রের penetration এর একটা পরিমিতি। আর আলোর বেগ সেজন্যে শূণ্য মাধ্যমে ধ্রুব, কেননা ধরা হচ্ছে ভ্যাকুয়ামে এই দুটোর মান অপরিবর্তনীয়। অন্যান্য মাধ্যম, যেমন কাঁচ কিংবা পানি ইত্যাদিতে এর মান ভিন্ন, কিন্তু মাধ্যম সমস্তত্ব হলে সেখানেও তা ধ্রুব। উদাহরণ স্বরূপ পানি কিংবা কাঁচে আলোর বেগ ভিন্ন (প্রতিসরাঙ্ক পরিমাণ কম)। যেমন, কাঁচের মধ্যেই যদি পারমিয়াবিলিটি আর পারমিটিভিটির গ্রেডিং থাকে তাহলে আলোর বেগ আলাদা হবে, যা করা হয় ফাইবার অপ্টিক কমিউনিকেশনে। আশা করি জবাব পেয়েছেন।
পর্ব ৩ পড়েছেন নিশ্চয়ই। ওখানে সূর্য 'নাই' হয়ে যাবার এক থট এক্সপেরিমেন্ট আছে। ওটা আবার পড়ে দেখেন। ওখানে বলা হয়েছে, স্থান-কালের বক্রতাই গ্র্যাভিটির প্রকাশ। তাই হঠাত সূর্য নাই হয়ে গেলে এর কনফার্মেশন আমাদের কাছে আসার আগেই পৃথিবী কক্ষচ্যুত হবেনা। যে মূহুর্তে আলোর কনফার্মেশন আসবে (৮ মিনিট ২০ সেকেন্ড পরে) ঠিক সেই সময়েই পৃথিবী কক্ষচ্যুত হবে (অর্থাৎ গ্র্যাভিটির প্রভাব থেকে মুক্ত হবে)। আর পৃথিবী সূর্যের চারিদিকে ঘুরছে স্থান ও কালের বক্র এক ফেব্রিকের উপর দিয়ে। এই বাঁকা স্থান কালই গ্র্যাভিটি, আর এর প্রকাশ ও প্রয়োগ হয় গ্র্যাভিট্যাশনাল ওয়েভ দিয়ে। অর্থাৎ, সূর্য নাই হয়ে গেলে স্থান কালের ফেব্রিকে একটা আন্দোলন সৃষ্টি হবে, যেমন স্থির পানিতে ঢিল ছোঁড়া হলে পানিতে তরংগ তৈরী হয়। সেই আন্দোলনই গ্র্যাভিট্যাশনাল ওয়েভ। এটা ডিটেক্ট করার পরীক্ষা চলছে বর্তমানে। তবে আগে যেভাবে বললাম, গ্র্যাভিটি দূর্বলতম বল, তাই গ্র্যাভিটেশনাল ওয়েভ ডিটেক্ট করাও দূরুহ। তবে প্রচেষ্টা চলছে।
আর 'গ্র্যাভিটেশনাল ওয়েভের' সাথে অনেকে 'গ্র্যাভিটি ওয়েভ' কে গুলিয়ে ফেলে। প্রথমটা, স্থান-কালের মধ্যে তৈরী তরংগ, আর দ্বিতিয়টা, চাঁদের আকর্ষণে তৈরী জোয়ার-ভাটার মাধ্যমে প্রকাশিত ওয়েভ (তবে ব্যাপারটা আরো generalized)।
--শাহবাজ
কিংশুক
জানুয়ারি ১৭, ২০১২ at ১২:৩১ পূর্বাহ্ণ (UTC 6) Link to this comment
প্রত্যেকটি পর্বই খুব ভালো লেগেছে । বিজ্ঞানের সাথে অনেক ইতিহাসও জানা যাচ্ছে ।
শাহবাজ নজরুল
জানুয়ারি ১৭, ২০১২ at ৫:৩৮ পূর্বাহ্ণ (UTC 6) Link to this comment
Compliments এর জন্যে ধন্যবাদ। সাথে থাকুন। যদিও প্রথমে অনেক পাঠক থাকলেও একন পাঠক সংখ্যা কমে এসেছে। আগামী ২-১ টার মধ্যে এই উপপর্ব শেষ করবো ইনশাল্লাহ।
ফুয়াদ দীনহীন
জানুয়ারি ১৭, ২০১২ at ৬:০১ পূর্বাহ্ণ (UTC 6) Link to this comment
@শাহবাজ নজরুল,

People love to read from one view point. Changing view point or the door readers will look, can make them confused. Therefore, I think, we should write from one side and our article should give one clear meaning. Dividing article with new name has no wrong. Just make a umbrella name, then give new name so that readers can easily follow.
শাহবাজ নজরুল
জানুয়ারি ১৭, ২০১২ at ৭:৩১ পূর্বাহ্ণ (UTC 6) Link to this comment
মাথার উপ্রে দিয়া গেল …
ফুয়াদ দীনহীন
জানুয়ারি ১৭, ২০১২ at ১০:৫৯ পূর্বাহ্ণ (UTC 6) Link to this comment
মাঝে মাঝে কিছু বিষয় মাথার উপর দিয়ে যাওয়া ই ভাল,
|
আপনার শিরোনামের কারণে পাঠক ভাগবে ভয়ে, পড়তে আসবে না | পাঠক ধারাবাহিক নাটক দেখতে চায় না | একেবারে শেষ এমন নাটক দেখতে চায়| প্রতিটি লেখার আলাদা আলাদা শিরোনাম করুন| তারপর সব একসাথে যোগ করতে পারেন| লেখার ফোকাস একজন মানুষ বলতেছে হলে ভাল হয়, বার বার কেন্দ্র চেইঞ্জ হলে মানুষ ধরতে পারে না আপনি আসলে কি বলতে চাচ্ছেন|
আবু সাঈদ জিয়াউদ্দিন
জানুয়ারি ১৮, ২০১২ at ৪:৫৪ পূর্বাহ্ণ (UTC 6) Link to this comment
পড়লাম -- ধন্যবাদ সহজ ভাষায় বিজ্ঞান পড়ার সুযোগ তৈরীর জন্যে।
শাহবাজ নজরুল
জানুয়ারি ২০, ২০১২ at ৯:৪৮ পূর্বাহ্ণ (UTC 6) Link to this comment
জিয়া ভাই,
পড়ার জন্যে ধন্যবাদ। আগের পর্বগুলো না পড়ে থাকলে সময় করে পড়ে নেবেন আশা করি। আর সামনের পর্বগুলোতে সাথে থাকুন।
--শাহবাজ
সরোয়ার
জানুয়ারি ২০, ২০১২ at ৯:০২ পূর্বাহ্ণ (UTC 6) Link to this comment
মনোমুগ্ধকর। ফেসবুকে শেয়ার দিলাম।
শাহবাজ নজরুল
জানুয়ারি ২০, ২০১২ at ৯:৫০ পূর্বাহ্ণ (UTC 6) Link to this comment
সরোয়ার ভাই,
আপনি কই? আপনার কমেন্ট মিসাইতেছি। যাইহোক শেষ পর্যন্ত আসলেন। উতসাহের জন্যে ধন্যবাদ। সাথে থাকুন।
--শাহবাজ